Saturday, November 21, 2020

 

­


­বাংলা কবিতায় অলোকরঞ্জনী অবদান

–হরভজন সিংকে আবার ধরিয়ে দেবে না তো?

ফোনের অন্য প্রান্তে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। এ পাশে আমি। কথা হচ্ছে আশ্বিনের এক বিকেলে।

আমি বললাম, না, সতীশ ভার্মা নেই আজ আমার সঙ্গে। অলোকদা বললেন, যাক। তাহলে নিশ্চিন্তে কথা বলা যাবে।

পাঞ্জাবি ভাষার কবি সতীশ ভার্মার নাম তিনি দিয়েছিলেন হরভজন সিং। জার্মানিতে একবার ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে গিয়েছিলাম আমরা চারজন ভারতীয় কবি। সেই কবি-চতুষ্টয়েরই একজন ছিলেন সতীশ ভার্মা। তিনিই হয়ে ওঠেন অলোকরঞ্জনের হরভজন সিং। কী করে? বলছি। হাইডেলবার্গ শহরে সতীশ ভার্মা অলোকদার মনোরম, চিন্ময় সান্নিধ্যে খুবই  উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিলেন।  ভারতে ফিরে আসার পরেও ফোনে মাঝে মাঝেই আমার কাছে অলোকদার খোঁজখবর নিতেন।  পরে একবার  আমি পাতিয়ালায় গিয়েছি বক্তৃতা করতে, বিকেলের দিকে যথারীতি ফোন এল অলোকদার। আমার সঙ্গে তখন সতীশ ভার্মা। তিনি, অলোকদা ফোন করেছেন জেনেই এতখানি উত্তেজিত হয়ে ওঠেন যে, প্রায় আমার কাছে থেকে ফোন কেড়ে নিয়েই কথা শুরু করে দেন অলোকদার সঙ্গে। এবং দীর্ঘ ছিল সে কথোপকথন। অলোকদার জরুরি কিছু কথা সেদিন আর বলাই হয়ে ওঠেনি আমায়। এরপর থেকে ফোন করলেই তিনি প্রথমেই জিগ্যেস করতেন, ফোন আবার হরভজন সিংকে ধরিয়ে দেবে না তো? সতীশ ভার্মা হয়ে উঠেছিল তাঁর হরভজন সিং। আমি বুঝতে পারতাম যে, সেদিনের ঘটনায় তিনি ঈষৎ ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন, কিন্তু সেই বীতরাগ প্রকাশের জন্য রূঢ় কোনও বাক্য তাঁকে ব্যবহার করতে হয়নি, কেবল ব্যবহার করেছিলেন দু’টি শব্দ; পালটে নিয়েছিলেন আমার এক বন্ধুর নাম।

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের অপ্রতুল স্নেহ আমার এই তুচ্ছ জীবনে মাণিক্যের গুপ্ত ভান্ডারের মতো উদ্ভাসিত হয়েছিল। তাঁর  সঙ্গে কাটানো সময়ের টুকরো টুকরো অনুপম স্মৃতি আমার জীবননির্বাহের পুঁজিকিন্তু, সেই স্মৃতিচারণের জন্য এই লেখা নয়। বরং ওঁর কবিতা নিয়ে আমার পাঠ-অনুভবের দু’একটি প্রধান কথা বলার জন্যেই এগারোশো শব্দের এ আয়োজন। যার প্রথম কথাটি হল এই যে, যখনই তাঁর কবিতা পড়ি, মনে হয় যে, পাঁচের দশকের কবিদের মধ্যে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত অনন্য, বিশিষ্ট। কেন? কারণ, তিনি এক যোগসূত্র। কীসের? বলছি। তার আগে আসুন পড়া যাক তিনটি পঙ্‌ক্তি:

কে ছড়াল এই দুঃসহ মহানিশি

বিনিদ্র চোখ, নীরন্ধ্র নির্জনে

বাসনার বুড়ি ডাইনি গেল না সুদূর নির্বাসনে?

পঙ্‌ক্তিগুলি তাঁর প্রথম জীবনে লেখা “নির্জন দিনপঞ্জি” কবিতার অংশ। মনে হচ্ছে না যে, বিষ্ণু দে কথা বলছেন যেন? ওই একই কবিতায় আবার তিনি লিখছেন:

       উদাসীন মেঘে মেঘে            ফুটে আছে থোকা থোকা

                      আরক্তকরবী:

         সমস্ত আকাশ যেন গগনেন্দ্র ঠাকুরের ছবি

এইবার কিন্তু স্বর পালটে গেছে। ভীষণ স্মার্ট, এই সময়ের এক তরুণ কবির লেখা বলে এই পঙ্‌ক্তিগুলিকে অনায়াসেই গ্রহণ করা যায় ভাষার একেবারে কথ্য একটি চলনকে এখানে ছন্দোবন্ধে ধরে ফেলেছেন অলোকরঞ্জন। খানিকটা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মতো। আমার কেন জানি না মনে হয় যে, পাঁচের দশকে যে তুমুল ভাঙচুরের মাধ্যমে নিজেদের স্বতন্ত্র প্রতিপন্ন করতে আগ্রহী ছিলেন তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরা, তিনি তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু সেই দাঁড়ানোটিও আরও যাঁরা মূলস্রোতের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁদের মতো ছিল না। ওঁর কবিতার ভাষা সুনীল-শক্তি-তারাপদ-উৎপল-শঙ্খ-প্রণবেন্দু বা আলোক সরকার–এঁদের কারও কবিতার মতোই নয়। আসলে বাংলা কবিতার অনতিদূর অতীত ও তৎকালীন বর্তমানের মধ্যে অলোকরঞ্জন এক যোগযূত্রের কাজ করছিলেন। যেন সন্ধান করছিলেন যে ভাষায় বিষ্ণু দে এবং সুভাষ মুখোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই লিখে ফেলেছেন কবিতা, সেই ভাষায়  তাঁদের অনুজ হিসেবে ঠিক কীভাবে লেখা উচিত কবিতা; খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন ঐতিহ্যকে কীভাবে ব্যক্তিগত প্রতিভা আত্তীকরণ করতে পারে, সেই পথ। আশ্চর্যের বিষয় এটিই যে, এই অনুসন্ধান যে ভাষার এবং আঙ্গিকের জন্ম দিয়েছিল বাংলা কবিতায় সেই ভাষা ও আঙ্গিক হয়ে উঠেছিল বিশিষ্ট, যাকে বলা হয় ‘অলোকরঞ্জনী’, যাকে পরবর্তীতে আর কেউই (প্রচেষ্টা সত্ত্বেও) সঠিক ভাবে আত্মস্থ করতে পারেননি।

এইখানে বলে রাখা ভালো যে, বিষয়ের দিক থেকে অবশ্যই অতি সমৃদ্ধ অলোকরঞ্জনের কবিতা। কিন্তু তাঁর অবলোকনের মাধুর্যে ও আশ্চর্যে, বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কবিতার বিষয়ের পরিব্যপ্তিতে, আস্তিকতার নতুন সংজ্ঞা নির্মাণে, ইউরোপীয় পুরাণ বা সমকালীন বিশ্ববাস্তবতার অভিঘাতে ভূকম্পপ্রবণ যে-অলোকরঞ্জনকে আমরা পাই, তিনি আমাদের মুগ্ধ করলেও, ‘অনন্য’ হয়ে ওঠেন না। এই বৃদ্ধি এবং ব্যাপ্তি বরং স্বাভাবিক। পর্ব থেকে পর্বান্তরে কবিদের যাত্রা প্রায়শই এমনটাই হয়ে থাকে। আমি যখন পড়ি “আমি যত গ্রাম দেখি/ মনে হয়/ মায়ের শৈশব” তখন আমার চক্ষু আর্দ্র হয়ে ওঠে। আবার যখন পড়ি, “ঈশ্বরের সঙ্গে এক বিছানায় শুলে/অনাচারী নাম যদি রটে তো রটুক”, বা “পাখিটির মাতৃভাষা চেয়ে থাকা” তখন চমকিত হই। কিন্তু, সত্যি বলতে কি, বহু বাংলা কবিতা পড়তে গিয়েই এভাবে আমার চোখ বারেবারে আর্দ্র হয়েছে, বাংলা কবিতার অনেকানেক পঙ্‌ক্তিই তাদের মেধার দীপ্তিতে, অনুভবের প্রগাঢ়তায় বারেবারে আমাকে চমকে দিয়েছেতাই মনে হয়, বিষয়ের বৈভব বা অবলোকনের আশ্চর্য নয়, আঙ্গিকের অনুসন্ধান এবং প্রাপ্তিই অলোকরঞ্জনকে বাংলা কবিতায় বিশিষ্ট করে রাখবে। বাংলা কবিতার ভুবনে, আমার পাঠে, এটিই তাঁর মূল অবদান।

       আঙ্গিক নিয়ে তাঁর নিজস্ব কিছু ধারণাও কবিতাতেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন  অলোকরঞ্জনএকটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেনঃ

       কে তবু বলল ট্রামে উঠবার আগে:

“এবার কিন্তু আঙ্গিক বদলান”

এরও পরে আরেকটি কবিতার শিরোনাম তিনি অবশ্য দিয়েছিলেন, “যেন আঙ্গিক না ভুলি”সত্যি কথা বলতে কি, আঙ্গিক আজীবন বদলাননি অলোকরঞ্জন। তিনি স্মরণে রেখেছিলেন যে, কবিতা শেষ পর্যন্ত এমন একটি শিল্প যার মূল উপাদান শব্দ। ভাষাকে মেজে-ঘষে নবীনের বিভা দান করা কবির এক বড় কাজ। শব্দকে তাই যুগপৎ তার প্রাগৈতিহাসিকতা ও দৈনন্দিনতা থেকে মুক্ত করেছিলেন তিনি, প্রমাণ করেছিলেন কবি তিনিই যাঁর ‘হাতের কাজে’ তুচ্ছের পাশে বসতে পারে মহৎ, বর্জনীয় হয়ে ওঠে গ্রহণীয়।  তাই অনায়াসে তিনি লিখে ফেলেনঃ

        সুদেষ্ণার মাকে দ্যাখো, তিনি

সপ্রতিভ, ততোধিক সপ্রতিভ একটি যুবক

রোচিষ্ণু চিবুক ছুঁয়ে ললন্তিকা গলার হারের

প্রশংসায় গলে গিয়ে অন্য ললনার দিকে হেসে চলে যায়

শুধু যে ‘চিবুক’-এর পূর্বে ‘রোচিষ্ণু’ শব্দটি তিনি সংযুক্ত করতে পারেন তাই নয়, প্রয়োজনে ‘আরক্তকরবী’র মতো শব্দ তিনি তৈরিও করে নেন। লেখেন “সাগরশায়ী তোমার গভীরতা”; লেখেন ‘স্বপ্নী’ আর ‘স্বপ্নিনী’র মতো শব্দসন্দেহ নেই যে, রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় তাঁর মতো এত নতুন শব্দ আর কেউ নির্মাণ করেননি।

       অন্তমিলের যে জাদু তিনি দেখিয়েছেন, তাও কি তাঁর মতো, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া, আর কেউই অর্জন করেছেন বাংলা কবিতায়? প্রথম জীবনেই তিনি লিখে ফেলেছিলেন:

পুরুষোত্তম দেবদারু দেখো ওই

মাথার উপরে দুয়েকটি মেঘ ছাড়া

আর কিছু নেই, কেউ নেই। অদ্বয়ী

দেবদারু একা, শান্ত সর্বহারা।

“দেখো ওই’-এর সঙ্গে “অদ্বয়ী”র মতো শব্দের মিল তিনিই দিতে পারেন। বা দিতে পারেন ‘সত্য’র সঙ্গে ‘গদ্য’র মিল:

 

সত্য সত্য

অবনীন্দ্রনাথের গদ্য।

লিখতে পারেন:

ধানী শাড়িতে ধনী যখন তাকায় ভীরু-ভীরু

জান কি তাকে? ‘আমার দিকে ফিরুক।’

যদি না ফেরে, যদি শুধুই নিরপেক্ষ রহে?

‘দধীচিসম ধৈর্য বুকে দহে।’

তাহলে তুমি দুঃখ জান? ‘বিলক্ষণ জানি।’

তাহলে কেন আত্মার বনানী

পিছনে ফেলে টেবিল টেনিস খেলতে গিয়ে শেষে

নাগরিকের চলস্রোতে হঠাৎ যাও ভেসে?

এ জিনিস কেবল অলোকরঞ্জনের পক্ষেই সম্ভব। ‘আত্মার বনানীর’ দু’টি শব্দ পরেই তিনি বসাতে পারছেন ‘টেবিল টেনিস’-এর মতো শব্দবন্ধএকইভাবে, যে-কবিতাতে তিনি দিচ্ছেন ‘ভীরু’র সঙ্গে ‘ফিরুক’-এর মিল, সেই একই কবিতাতেই তিনি দিচ্ছেন ‘রহে’-এর সঙ্গে ‘দহে’-এর মিল। এ একেবারেই অলোকরঞ্জনী। তবে, অন্তমিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি একক থাকেননি। একথা স্বীকার্য যে, তাঁর উত্তরাধিকার বাংলা কবিতায় প্রবাহিত হয়েছে মুখ্যত জয় এবং শ্রীজাতর অন্তমিল ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে। তবে তাঁরা তাঁর কাজকে অগ্রবর্তী করলেও, অতিক্রম করেছেন বলে আমার মনে হয়নি।

       লেখাটির এতদূর পর্যন্ত পড়ে যদি কারও এমনটা মনে হয় যে, আমি বলতে চাইছি অলোকরঞ্জন কেবলই আঙ্গিক-সর্বস্ব একজন কবি, তাহলে আমার অভীষ্ট সিদ্ধ হয়নি। আমার বলার কথা এইটুকুই যে, আঙ্গিকের ব্যবহারই তাঁকে বিশিষ্ট করেছে, ভিড়ের মাঝে একা করে দিয়েছে।  অম্লান স্বতস্ফূর্ততায় তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কবিতা শেষ পর্যন্ত শব্দের শিল্প। একই ব্যক্তিকে ‘সতীশ ভার্মা’ আর ‘হরভজন সিং’ এই দুই নামে ডেকে, ভিন্ন ভিন্ন শব্দের ব্যবহারে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব ব্যবহারকর্তার অনুরাগ বা বীতরাগ। বলতে চেয়েছেন যে, কবিকে শেষ পর্যন্ত আয়ত্ত করতেই হয় শব্দের ব্যবহার। শব্দই ব্রহ্ম।

 


Thursday, November 19, 2020

 


ডুব

অংশুমান কর

কে বলবে যে, দু’দিনের ট্রেন জার্নি করে ওরা অষ্টমঙ্গলা থেকে ফিরেছে মাত্র দু’দিন আগে! কথা বলেই চলেছে, বলেই চলেছে প্লাবন আর নদী! যাচ্ছে নদীর মাসির বাড়ি।

       ওদের উলটোদিকের সিটে এক বয়স্ক দম্পতি। বসে রয়েছেন দু’জন মৃত মানুষের মতো। দেখে মনে হচ্ছে ওদের সব কথা ফুরিয়ে গেছে। ট্রেনে ওঠার পর থেকে সহযাত্রীদের সঙ্গে তো দূর অস্ত, নিজেদের মধ্যেও একটাও কথা বলেননি দু’জনে। শুধু মাঝে মাঝে তাকিয়ে থাকছেন জানলা দিয়ে। বাইরে। আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখছেন প্লাবন আর নদীকে। সেই দৃষ্টিও স্থির। রোবটের মতো। সেই দৃষ্টিকে এড়িয়েই প্লাবনের ইচ্ছে করছিল নদীতে টুক করে একটা ডুব দিতে। এই ক’দিন বারবার নদীতে ডুব দিয়েও ওর আশ মিটছে না কিছুতেই। ওকে কোনওমতে নিরস্ত করে ফিশফিশ করে নদী বলল, “সামনে দেখ, ওই বয়সে পৌঁছে দেখব কত বেঁচে থাকে প্রেম!”

       গুম মেরে গেল প্লাবন। ভয় হল। সত্যিই ওরা যখন ওই বৃদ্ধ দম্পতির বয়সে পৌঁছবে, তখন কি বেঁচে থাকবে ওদের প্রেম? নাকি মৃত মানুষের মতো চিরকালের জন্য নীরব হয়ে যাবে? ওদেরও দৃষ্টি হয়ে যাবে রোবটের মতো?

       একটা হল্ট স্টেশনে ট্রেনটা থামল। প্ল্যাটফর্ম বেশ নিচু। বৃদ্ধ-বৃদ্ধা নামছেন। আগে বৃদ্ধ। নেমে তিনি বাড়িয়ে ধরলেন তাঁর হাত। সেই হাত ধরে বৃদ্ধা নামলেন। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন দু’জনে। যথারীতি নীরবে।

       প্লাবন দেখছিল। নদী কানের কাছে ফিশফিশ করে বলল, “ওই বয়সে পৌঁছে দেখব কত বেঁচে থাকে প্রেম!”

       এবার মৃদু হাসল প্লাবন। চোখ রাখল নদীর চোখের ওপর। ওর মনে হল ডুব দেওয়ার জন্য সবসময় নদীতে ঝাঁপ না-দিলেও চলে। মনে হল, একটা বয়সের পরে প্রেম মানে যত কথা, তার চেয়ে বেশি নীরবতা।

 

অঙ্কনঃ প্রণবশ্রী হাজরা

 


Saturday, November 14, 2020

 



পাপ-পুণ্য

মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। তার হাতের ময়লা। তবু সেইটুকু টাকা নিয়েই প্রতি মাসে শর্মিলা হাঙ্গামা বাঁধায়। বলে, তুমি ওদের অভ্যেস খারাপ করে দিচ্ছ। তার ওপরে মিথ্যে বলছ। এটা পাপও। আর মনে রেখো গরীব মানুষের মন থাকে না। টাকা ছাড়া ওরা আর কিচ্ছু বোঝে না।

সন্দীপন কিছু বলে না। শুধু হাসে।

       প্রতি মাসে সাত তারিখের মধ্যেই টাকাটা দিতে যায় সন্দীপন। মাসিমার হাতেই তুলে দেয়। টাকাটা হাতে নিলেই চোখ-মুখে যেন এক অদ্ভুত জ্যোতি জন্ম নেয় বৃদ্ধার। স্বাতী কিছু বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মাসিমার খাটের গা ঘেঁষে। তার সেই রূপ আর নেই। মুখে এরই মধ্যে বলিরেখা। অভাব রূপ কেড়ে নেয়।

       মাসিমার হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দেওয়ার অনুরোধটা নির্মাল্য যখন ওকে করেছিল তখন সন্দীপন ভেবেছিল নির্মাল্য বুঝি মজা করছে। নির্মাল্য বলেছিল যে, বিয়ের পর থেকে আজ অবধি কোনও রোজগার করেনি ও। মেসোমশাই যতদিন বেঁচেছিলেন ওঁর মাইনে আর পেনশনই সংসার সামলেছে। মেসোমশাই মারা যাওয়ার পরে যেটুকু রোজগার করার স্বাতীই করে, সেলাইফোঁড়াই করে। নির্মাল্য  বলেছিল, বউয়ের রোজগারে খেতে ওর খুব লজ্জা লাগে। মাসিমা ওকে খোঁটা দেন। বলেন যে, ওর এক পয়সা রোজগার করার মুরোদ নেই। বলেছিল যে, কথাটা সত্যি। ও বহুবার চেষ্টা করেও রোজগার করতে পারেনি। চাকরি তো পায়ইনি, ব্যবসা করতে গিয়েও লস হয়েছে। ও সত্যিই রোজগার করতে পারে না।  কিন্তু সত্যি কথাটা ও হজম করতে পারে না। তাই ও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে। আর ও যদি নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, তাহলে  সন্দীপন যেন মাসে মাসে পাঁচ হাজার টাকা মাসিমাকে দিয়ে আসে। যেন বলে যে, এটা নির্মাল্যর রোজগার। বলেছিল যে, টাকাটা দিতে সন্দীপন বাধ্য কেননা এতে নাকি ওর ঋণ শোধ হবেক্লাস এইট পর্যন্ত ক্লাসে তো নির্মাল্যই ফার্স্ট হত। ক্লাস এইটের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় একটা দশ নম্বরের অঙ্ক সন্দীপনকে দেখিয়ে দিয়েছিল নির্মাল্য। ওই দশ নম্বরের লিড নিয়েই সেবার ফার্স্ট হয় সন্দীপন। সেকেন্ড নির্মাল্য। তবে ওই পরীক্ষার পর থেকে সন্দীপনকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। কিন্তু ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকে নির্মাল্য। হায়ার সেকেন্ডারিতে সায়েন্স নিয়ে ফেল করে। তবে স্বাতী ওকে ছেড়ে যায়নি।

       এই কথাগুলো বলে সত্যিই নিরুদ্দেশ হয়ে যায় নির্মাল্য। একটা পোস্টকার্ড অবশ্য লিখেছিল সন্দীপনকে। তাতেও টাকার কথাটা লিখেছিল ও। পোস্টকার্ডটা এসেছিল উত্তরপ্রদেশ থেকে। তবে থানা-পুলিশ করে কোনও লাভ হয়নি। খোঁজ পাওয়া যায়নি নির্মাল্যর।

       স্বাতী সবটা জানে। প্রতিবার টাকাটা দিয়ে যখন সন্দীপন ফিরে আসে ওর মলিন মুখ আরও মলিন হয়ে যায়।

       আজ ওঠবার মুখে সন্দীপনকে বলল, একটু দাঁড়ান। বলে ভেতরের ঘরে গিয়ে একটা ছোট কৌটো ভরতি নাড়ু নিয়ে এসে ওর হাতে দিল। বলল, বিজয়ার পরে এলেন, আপনার জন্য বানিয়েছি

সন্দীপন নেবে কিনা ভাবতে ভাবতে কৌটোটা নিল। এই নাড়ু নিয়ে বাড়িতে গেলে শর্মিলা ঝামেলা করবে ও জানে। কিন্তু  স্বাতীকে না-বলার ক্ষমতা ওর নেই। ভাবল শ্যামলকে দিয়ে দেবে। শ্যামল ওর ড্রাইভার।

সন্দীপন কৌটো নিয়ে চলে আসছিল। স্বাতী বলল, একটা কথা বলব?

–বলুন।

–এটা পাপ হচ্ছে না? এই মিথ্যে? এই খেলা?

–সব সত্যি সহ্য করা যায় না। জীবনে বাঁচতে গেলে একটু মিথ্যে লাগে। সোনার গয়নাতে যেমন লাগে খাদ।

বলেই আর দাঁড়াল না সন্দীপনহনহন করে হাঁটা দিল গাড়ির দিকে।

       নাড়ুর কৌটোটা শ্যামলকে শেষমেশ আর দিল না সন্দীপন। শর্মিলাকেই দিল। তবে স্বাতীর কথাটা চেপে গেল। বলল, মাসিমা পাঠিয়েছেন, তোমার জন্য।

       শর্মিলার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কৌটো খুলে একটা নাড়ু মুখে ফেলে বলল, বাহ, দারুণ বানিয়েছেন তো! ভদ্রমহিলার কিন্তু মন আছে। 

সন্দীপন কিছু বলল না। একটু হাসল শুধু। 

এই হাসিতে অবশ্য খাদ নেই।

 

অঙ্কন:  শ্রীমহাদেব

      

 

Thursday, October 29, 2020

 


আসলে কেউ বড়ো হয় না, বড়োর মতো দেখায়”–এই কথাটি কিন্তু পুরো সত্য নয়। কবিতার সত্য। আমরা হয়তো চাই একটি শিশুকে আমাদের হৃদয়পুরে বাঁচিয়ে রাখতে, কিন্তু বাইরের পৃথিবী তো তেমনটা চায় না। তার আছে নিজের নিয়ম। সে তাই গাছের গোড়া খুঁচিয়ে দেবার মতো আমাদের পায়ের নীচের মাটি খুঁচিয়ে দেয়। ডালপালা ছেঁটে দেয়। যাতে আমরা বড় হয়ে উঠি।

    কিন্তু ঠিক কবে আমরা বুঝতে পারি যে, আমরা বড় হয়ে গেছি? কাঙালী তার মায়ের মৃত্যুর পরে একদিনেই ‘বুড়া’ হইয়া গিয়াছিল। আমাদেরও কি ওইরকম এক ধাক্কা দরকার হয় জীবনে? বড় হতে?


    আমার মনে আছে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় আমি প্রথম বেপাড়ায় একা একা যাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলাম। আমার দিদিদের গানের সঙ্গে তবলা বাজাতে আসত কানাইকাকু। আমাদের গ্রামে রাধাবাজার থেকে ধর্মতলায় যাওয়ার পথে কানাইকাকুর বাড়ি। কোনও কোনও বিকেলে জেঠু আমার হাতে ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলত কানাইকাকুদের বাড়ি থেকে চিড়ে নিয়ে আসতে। ঘরে বানানো চিড়ে। ওই কানাইকাকুদের বাড়িতেই আমি প্রথম ঢেঁকি দেখেছিলাম। তো, মাঝে মাঝে যখন খেলার মাঠ থেকে বিকেল বেলা আমাকে ডেকে জেঠু হাতে ধরিয়ে দিত ব্যাগ, তখন প্রথমটা একটু মনখারাপ হলেও, পরে কিন্তু দিব্যি লাগত। ব্যাগ হাতে হাঁটতে হাঁটতে মাথাটা একটু নিচু করে নিতাম। ভাবখানা করতাম এমন যেন রাজ্যের চিন্তার ভারে বড় মানুষের মতো মাথাটা একটু ঝুঁকে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতাম এই তো, দিব্যি বড় হয়ে গেছি, হাঁটার ভঙ্গিতেই কেমন বিজ্ঞ বিজ্ঞ লাগছে! কিন্তু কানাইকাকুদের বাড়ি পৌঁছেই ভেঙে যেত ইলিউশন, তাদের আদরে আপ্যায়নে। আমি হয়ে যেতাম সত্যবাবুর ভাইপো, ছোট্ট একটা ছেলে।  বুঝে যেতাম এখনও তো বড় হইনি আমি, ছোট আছি ছেলেমানুষ বলে।


    তাহলে ঠিক কবে বুঝেছিলাম যে, বড় হয়ে গেছি আমি? সেইদিন যেদিন ক্লাস এইটে উঠে প্রথম পড়েছিলাম ফুলপ্যান্ট? নাকি সেইদিন যেদিন বাবার দ্বিতীয় হার্ট অ্যাটাকের পর ডাক্তারবাবু বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজের আলোছায়া মাখা এক করিডোরে দাঁড়িয়ে ক্লাস ইলেভেনের আমাকে বলেছিলেন, “তুমিই বড় ছেলে! শুনে রাখো তোমার বাবা যে কোনও সময়ে এক্সপায়ার করতে পারেন? নাকি সেইদিন যেদিন আমারই বয়সি এক তরুণী বাসে আমাকে বলেছিল, কাকু, উঠলে সিটটা দেবেন, সেইদিন?


    বড় হতে তো আমরা সত্যিই চাই না তাই তো ছেলেবেলার জন্য এত হাহাকার।  তাই তো হৃদয়পুরের শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কত কিছুই করতে থাকি আমরা। করি আমিও। সময় পেলেই ছোটদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলি, খেলি লুকোচুরি। শিশু সেজে থাকার এই খেলা খেলতে খেলতেই একদিন হঠাৎ বুঝে গিয়েছিলাম  আর ছোট্টটি নেই আমি।


    সেদিন খেলছিলাম আমার বড় ভাইপো আহানের সঙ্গে। সে খেলার মাঝে হঠাৎই আমাকে জিগ্যেস করেছিল, জেঠুন, তুমি একটা মুনকে দুটো করতে পারবে? আর তারপর আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে হাতে ধরে থাকা বিস্কুটটা ভেঙে দুটুকরো করে দিয়ে বলেছিল, এই দেখো, দুটো মুন। আমি দেখেছিলাম ওর দুই হাতে ধরা অর্ধচন্দ্রাকৃতি দুটো বিস্কুট, মানে দুটো মুন। চমকে উঠেছিলাম। ভেবেছিলাম, কল্পনার এত দৌড়! ভেবেছিলাম যে, এই ভাবনা যদি আমি ভাবতাম তাহলে নিশ্চয়ই একটা কবিতা লিখতাম আর আশা করতাম বন্ধু-বান্ধবদের হাততালি। আহান তো সেসব কিছুই করল না। বরং চায়ে ডুবিয়ে সাধের মুনকে খেয়ে ফেলল অনায়াসে!


    সেদিনই আমি বুঝেছিলাম যে, বিস্কুটকে সহজে চাঁদ মনে করার বয়স আমি পেরিয়ে এসেছি। বুঝেছিলাম যে, কল্পনাকে আমি কল্পনাই মনে করি; তাকে ছোটদের মতো বাস্তবেরই স্বাভাবিক অংশ বলে ভাবি না। বুঝেছিলাম যে, বড় হয়ে গেছি, চাইলেও আর ছোটদের জগতে  ফিরে যেতে পারব না। বুঝেছিলাম যে, কবিতার সত্য বাস্তবে মিথ্যে হয়ে যেতেও পারে।


Friday, July 17, 2020

রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর


বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু নতুন শতাব্দীর এই দ্বিতীয় দশকের সমাপ্তিতে, মোটের ওপর, বাংলা কবিতার ভুবনে তিনি অনুপস্থিত। আমাদের ফেসবুকের বায়বীয় ঢক্কা-নিনাদেও তিনি কোথাও নেই। চিরকালই ছিলেন একটু লাজুক প্রকৃতির। পছন্দ করতেন অন্তরাল। তাই বোধহয় এভাবে নিজেকে নির্বাসিত করতে পেরেছেন তিনিসম্পাদকেরা এখন তাঁর কাছে লেখা চেয়েও পান না।

বাঁকুড়ার এক গন্ডগ্রাম বেলবনীতে বাস রাজকল্যাণ চেল-এর।  সেই ছোট্ট গ্রামটি থেকেই দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করেছেন ‘কবিতা দশদিনে’র মতো একটি সুচারু পত্রিকা। তরুণদের প্রাণিত করেছেন কবিতাযাপনে আর লিখে গেছেন একের পর এক অলৌকিক কবিতা। কী সব নাম তাঁর কবিতা গ্রন্থগুলির! ‘বন্দেগী জাহাঁপনা’, ‘তৈরি হচ্ছে পাহাড়’, ‘মৃদু লাঠিচার্জ’, ‘রোগা বাতানুকূল এক্সপ্রেস’—ঝকমকে সব নামে ‘গ্রাম্যতা’ (দোষ অর্থে) অনুপস্থিত। সাতের দশকে যখন ক্রমশ গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার স্বপ্ন গাঢ় হচ্ছিল বাংলা কবিতায়, যখন ধান ও জলের ধ্বনি বাংলা কবিতায় তৈরি করছিল এক অন্য দ্যোতনা, তখন রাজকল্যাণ চেল নির্মাণ করছিলেন এমন এক কাব্যভাষা যা তাঁর স্থানিক অবস্থানের বিপ্রতীপ; নির্মাণ করছিলেন এমন এক কাব্যভুবন যা প্রকৃত অর্থেই ছিল আন্তর্জাতিকতিনি লিখেছিলেন, “আমি কোথায় জন্মাইনি? পশ্চিমের পাহাড়ি গ্রামে/দক্ষিণের ফুল না ফোটা শহরে, রো রো নদীর ধারে, কিয়াংশী পাহাড়ের/বুনো নদীর তীর দিয়ে হেঁটে একবার  ফুল ফোটানোর কথা বয়ে/নিয়ে গিয়ে পূর্বাচলের এক দেশে আমি অনেক রাত্রি কাটিয়েছিলাম...আমি কোথায় জন্মাইনি? ইয়েনানের পথে, গুয়াতেমালায়, হাইতির নালার ধারে/সানতিয়াগের উনত্রিশ নং কবরের পাশে...”। বিচিত্র সব চরিত্র ভিড় করে এসেছে তাঁর কবিতায়। পল রোবসন যেমন বিষয় হয়েছেন তাঁর কবিতায়, তেমনই ঘুরে ফিরে এসেছেন শিল্পী ওয়েই আর কর্ণেল ক্যানিং এর মতো বাস্তব আর কল্পনার চরিত্র। বিভিন্ন গোষ্ঠী আর স্থানিক পরিচয়ে মানুষ যখন প্রকোষ্ঠে প্রকোষ্ঠে বিভক্ত, তখন যেভাবে গোষ্ঠী পরিচয়ের গন্ডি আর কাঁটাতারের বেড়ার উর্দ্ধে উঠে রাজকল্যাণ নির্মাণ করেন সংযোগের এক নতুন ভাষ্য,  তাতে বাংলা কবিতার ভূগোলকটি নিঃসন্দেহে নব্যপরিধি প্রাপ্ত হয়তাঁর কবিতায় তাই গ্রামদেশে বেড়ে ওঠা এক কবির স্বাভাবিক সঙ্গী তুলসী গাছের অনুষঙ্গ আসে না;  বরং ঘুরে ফিরে আসে বাদাম গাছ। তিনি লেখেন, “পৃথিবীতে সবকিছু শেষ হয়ে যায়/শুধু বাদাম গাছের ছায়ায় লালিত জীবন কখনো শেষ হয় না”; লেখেন, “অজস্র গাছের ভিড়ে গাছ টাছ যেগুলো আমরা দেখি/তাও আসলে বাদামেরই গাছ”।

গাছকে নিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছেন রাজকল্যাণ। সেরকমই একটি কবিতায় তিনি দাগিয়ে দিয়েছেন গাছের ঋজু দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিটি, “যখন আমি পৃথিবীতে দুটো হাত আর দুটো পা মেলে দাঁড়াই/তখন আমার সর্বপ্রথম যার কথা মনে পড়ে সে হল গাছ”। আসলে অবস্থান নেওয়া যে একজন কবির কাজ, শুধু সফলতার সত্যকে স্মরণে রেখে সমকালের রণ-রক্তকে বিস্মৃত হওয়া যে অপরাধ—একথাও বেশ স্পষ্ট করেই বারেবারে বলেছেন রাজকল্যাণ। লিখেছেনঃ “আমার মনে হয় কবিদের সবচেয়ে বড় কাজ/লক্ষ্য করা, মানুষের হাসি মিলিয়ে যাচ্ছে কেন?/...শুকনো বারুদের স্তূপে যারা পিকনিকে বসেছে/তাদের সতর্ক করে দেয়া/তাই নয় কি? আমার তো মনে হয় তাই-ইতো”। আক্ষেপ করেছেনঃ “একদঙ্গল মানুষ আরেক দঙ্গল মানুষকে মেরে ফেলছে/তবু মহাকাব্যের জন্ম হচ্ছে না/শুধুই গীতিকবিতার ভিড়”। কবি হিসেবে এই যে রাজকল্যাণের অবস্থান, এই অবস্থানের কারণেই, সম্ভবত, মাঝে মাঝেই তাঁর কবিতায় মৃদু লাঠিচার্জের শব্দ শোনা যায়; তাঁর রাজকীয় বিদ্রুপ  অব্যর্থভাবে লক্ষ্যভেদ করে। যেমন ‘বন্দেগী জাঁহাপনা’ কবিতায় তিনি লেখেন, “সারাদিন সেই জাহাঁপনাকে বন্দনা করি/যিনি বুনে চলেছেন অন্ধকারের পাতলা ও ঘন চাদর/যিনি কিছু নদীকে শুকনো করে কিছু নদীকে/করে তুলেছেন গর্ভবতী/ভুখা ভিখিরি মানুষের সাথে এক হাটে ছেড়ে দে’ছেন বেতো ঘোড়া/বন্দেগী জাহাঁপনা, বন্দেগী/এক হাতে তৈরি করেছেন তিনি উট/অন্য হাতে খর্জুর/এক হাতে পৃষ্ঠদেশ অন্য হাতে গন্ডারের চামড়া/কিন্তু/যে হাতে গান্ধী সেই হাতেই বেন কিংসলে/হাঃ হাঃ হাঃ”।

রাজকল্যাণের কবিতা অবশ্য কেবল বাংলা কাব্যভুবনের পরিধিকে বিস্তার দেওয়ার কাজেই থেমে থাকে না। প্রবেশ করে তার অন্দরে, নাভিদেশে; গভীর থেকে তুলে আনে এমন কিছু সংবেদ যা অনুভবে শাশ্বত, কিন্তু অবলোকনে নূতন। যেমনঃ  “পৃথিবীর সব জাদু খুলে যায় ঘন কৃষিকাজে” (‘শিল্প’), বা  “বাদামেরা কখনো ভেঙে চুরে নিজেরা বেরিয়ে আসে না/তারা শুধু অপেক্ষা করে, অপেক্ষা করে, আর অপেক্ষা করে/কারো নিঃশব্দ তর্জনীর স্পর্শের” (‘বাদামগাছ’)এইসব পঙ্‌ক্তি লিখেছেন যে কবি তিনি নামিয়ে রেখেছেন তাঁর কলম ভাবলে মনোবেদনা হয়। এই কঠিন সময়ে বাংলা কবিতা যে তাঁর কল্যাণময় স্পর্শের আকুল আকাঙ্ক্ষায় আছে, সে কথা কি রাজকল্যাণ অনুভব করছেন না?  

 

কবির ফোটো: তিমিরকান্তি ঘোষ


  ­ ­ বাংলা কবিতায় অলোকরঞ্জনী অবদান –হরভজন সিংকে আবার ধরিয়ে দেবে না তো? ফোনের অন্য প্রান্তে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। এ পাশে আমি। কথা হচ্ছে আশ...