Saturday, May 30, 2020

আনলকিং ওয়ানঃ লকডাউন তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি নিয়ে দু-একটি কথা

সারা দেশে কনটেনমেন্ট জোনের বাইরে ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া হবে লকডাউন। অর্থাৎ ‘আনলকিং’ শুরু হয়ে গেল। এই মর্মে সরকারি নির্দেশিকাও প্রকাশ পেয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যেসব সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই নেওয়া হল, তা কি বাস্তব সম্মত হল? বিশেষ করে এমন একটা সময়ে যখন দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে?

            একথা সত্যি যে, করোনা নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। একথাও সত্যি যে, করোনার সঙ্গে আমাদের ঘর করতে হবে এখন অনেকদিন। রপ্ত করতে হবে বিধিনিষেধ মেনে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার উপায়। এরপরেও সংক্রমণ হতেই পারে। এবং করোনা-আক্রান্তদের সুস্থ হওয়ার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে এটাও বোঝা গেছে যে, সংক্রমিত হলেও ঘাবড়ে গেলে চলবে না। কোভিড ১৯ ভাইরাস প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ততখানি ভয়ংকর নয় যতখানি ভয়ংকর সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে। কিন্তু তাই বলে কি সুরক্ষা নিতে হবে না? অযথা আতঙ্কিত না-হওয়ার সঙ্গে কিন্তু সুরক্ষাবিধি মেনে চলার কোনও বিরোধ নেই। আর ঠিক এখানেই অনলকিং-এর প্রক্রিয়াটিকে নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

            ৮ জুন থেকে বেসরকারি অফিস, শপিং মল, হোটেল-রেস্তরাঁ এবং ধর্মীয় স্থান–খুলে যাবে সবই। আমাদের রাজ্যেও ইতিমধ্যেই ঘোষণা হয়েছে যে, সরকারি অফিসেও কর্মীদের হাজিরা হবে সত্তর শতাংশ। অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলে দেশের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই দুমড়ে গিয়েছে একেবারে।  ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়েছে কেন্দ্র সরকারকে, যে প্যাকেজ নিয়েও বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে গেলে আনলকিং-এর প্রক্রিয়া যে শুরু করতেই হবে, এ নিয়ে আমার অন্তত দ্বিমত নেই। কিন্তু, যেভাবে এই প্রক্রিয়াটিকে ধাপে ধাপে  রূপায়িত করা হবে বলে মনে হচ্ছে তা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়।

            যেমন, প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় আসে তা হল, সামাজিক বিধি মেনে সরকারি এবং বেসরকারি অফিসে কর্মীদের যাতায়াতের সুব্যবস্থা করবে তো সরকারগুলি? বড় শহরগুলিতে মেট্রো তো বন্ধ থাকবে। থাকবে তো পর্যাপ্ত অন্যান্য পরিবহন? সুরক্ষাবিধি মেনে চলবে তো সেগুলি?  আনলকিং-এর আগের পর্বেই অফিসে যেতে কিন্তু খুবই বেগ পেতে হয়েছে সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার বেশ কিছু কর্মীদের। এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই সম্ভবত আমাদের রাজ্যে বাস-এ যত আসন ততজন যাত্রী নিয়ে ১ জুন থেকেই বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, বাসে উঠলে  যাত্রীদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিতে হবে। কিন্তু এতে কি ‘সামজিক দূরত্বের’ বিধি পালন করা যাবে? সন্দেহ নেই যে, আমাদের রাজ্যে আমফান করোনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করেছে। মানি যে, আমফান এবং করোনার সঙ্গে লড়তে গেলে অফিসগুলিতে সরকারি কর্মচারীদের একটি ভালো অংশের উপস্থিতিও প্রয়োজন। তাই এঁদেরও কি বিশেষ বিমার আওতায় আনা যায় না? কেন এই সুবিধে বেসরকারি সংস্থার কর্মীরাই বা পাবেন না? তাহলে অন্তত অফিসে যাওয়া-আসার পথে যে আতঙ্ক তাঁদের তাড়া করবে সর্বক্ষণ, সেই আতঙ্কের ভার খানিকটা লাঘব হত। পরিস্থিতি যা দাঁড়াচ্ছে তাতে আর শুধুমাত্র ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী বা জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরাই নন, অন্যান্য সরকারি এবং বেসরকারি কর্মীরাও এবার ঝুঁকি নিয়েই কাজ করবেন। যেমন এতদিন কাজ করছিলেন ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দিচ্ছিলেন যাঁরা, তাঁরা। অথচ, তাঁদের অবদানের কথাও খুব বেশি বলা হয়নি দু’মাসে। আনলকিংয়ের প্রক্রিয়া শুরু হলে, এই সমস্ত অংশের কর্মীদের কথাই কিন্তু সরকারগুলিকে ভাবতে হবে।

            আরও একটি প্রশ্ন। শপিং মল খোলার  খুবই কি দরকার ছিল এখন? বলা যেতে পারে যে, শপিং মলগুলিও দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে। বলা যেতে পারে যে, এই শপিং মলগুলিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। শপিং মল এরপর না-খুললে, কাজ হারাবেন অনেকে। মানলাম। কিন্তু শপিং মলগুলিতে মূলত যান মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত মানুষ। তাদের ক’জন যাবেন শপিং মলে, এখন, আতঙ্ক জয় করে? আর যদি শপিং মলই খোলা হল, তাহলে কি দোষ করল সিনেমা হল আর থিয়েটার হল? দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য শপিং মল খোলা হল নাকি চাপ এল সেই সমস্ত শিল্পপতিদের কাছ থেকে যাঁরা এই শপিং মল-এর চেনগুলির মালিক, যাঁরাই এই দেশের প্রকৃত ভাগ্যনিয়ন্তা–জানতে ইচ্ছে করছে তাও। ‘আত্মনির্ভর’ হওয়ার দর্শনের সঙ্গেও কি খুব মেলে শপিং মল-এর কার্যপ্রণালী? যেসব ‘প্রোডাক্ট’ শপিং মলগুলিতে বিক্রি করা হয়, তার কত শতাংশ দেশীয়? শপিং মল খুললেও, যদি বিক্রিবাটা তেমন না-হয়, তাহলে শপিং মলগুলির কর্মীরা কাজ হারাবেন না–এর কোনও নিশ্চিতি আছে? শপিং মলগুলি খোলার জন্যে আর ক’টাদিন অপেক্ষা করা যেত না?

            একইভাবে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না ধর্মীয় স্থানগুলি এখনই খোলার কি প্রয়োজন ছিল? ধর্মীয় স্থানগুলির সঙ্গে দেশের অর্থনীতির ঠিক কতখানি সংযোগ রয়েছে? মানি যে, আমাদের দেশে ধর্ম একটি খুব বড় বিষয়। ধর্মাচরণেরও বিরুদ্ধে আমি নই। কিন্তু যে দুই কবির জন্মদিন আমরা বাঙালিরা মে মাসে উদ্‌যাপন করে এলাম, সেই রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল তো বারবার ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে বলেছেন অন্তরে। এই যে ইদ উদ্‌যাপিত হল, কই অন্তরিন থেকে, এই ভয়ংকর সময়ে, মুসলিম ভাইবোনেদের নমাজ পড়তে কোনও অসুবিধে তো হল না! তাহলে ধর্মীয় স্থানগুলিকে খুলে দেওয়ার জন্যে কেন এই তাড়াহুড়ো? ধর্ম এ দেশে এমনই একটি আবেগ যে সম্পূর্ণ বন্ধ না-থাকলে, অনেকেই চলে যেতে পারেন মন্দির-মসজিদ-গীর্জায়। আমদের রাজ্যে বলা হয়েছে যে, একসঙ্গে দশজনের বেশি প্রবেশ করতে পারবেন না ধর্মীয় স্থানে। কিন্তু, সংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তো? একবার খুলে গেলে, ধর্মীয় স্থানগুলিতে ‘সামাজিক দূরত্বে’র বিধি রক্ষা করা কিন্তু অত সহজ হবে না। প্রশ্ন জাগে আরও। মনে হয়, ঈশ্বরের পরশ পাওয়ার জন্য কি যেতেই হবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে, এই ক্রান্তিকালে?  বরং একাকী মানুষই কি দেবতার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে সমর্পণ করতে পারেন না? হৃদয় পানে চাইলেই কি বোঝা যায় না যে, দেবতা আসলে লুকিয়ে আছেন হিয়ার মাঝে?

            লকডাউনের ঘোষণা হয়েছিল ঠিকঠাক পরিকল্পনা না-করেই। আজ যখন লকডাউন তুলে নেওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করল দেশ, তখনও মনে হচ্ছে যে, হিসেবে কিছু গোলমাল থেকে যাচ্ছে। এই গোলমালের ফলে যদি হু হু করে সংক্রমণ বেড়ে যায়, স্বাস্থ্যপরিকাঠামো সেই চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছে তো? ‘আনলকিং’-এর প্রক্রিয়া শুরুর সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে কিন্তু আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে স্বাস্থ্যপরিকাঠামোর কথা। 

                                                                                                  অংশুমান কর

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা



Friday, May 29, 2020

করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত থিয়েটার



নাটক আবার কবে হবে? অ্যাকাডেমিতে? গিরীশ মঞ্চে? ছোট ছোট শহরের ছেঁড়া স্ক্রিন টাঙানো অডিটোরিয়ামে? কবে? অনেকের মতো এই প্রশ্ন আমারও। আমারও, কারণ নাটক দেখতে আমার খুবই ভালো লাগে। কিন্তু কবে আবার অনেকের সঙ্গে হর্ষ-বিষাদে মাখামাখি হয়ে বাতানুকূল অডিটোরিয়ামে কিংবা পাখা ঘোরে না এমন হলে ঘামতে ঘামতে দেখতে পাব নাটক সে প্রশ্নের উত্তর এখনই আমার কাছে নেই। না, আমাদের কারো কাছেই নেই।

            করোনার শিকার কারা কারা হয়েছেন তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশদে চর্চা হয়েছে বিস্তর। কীভাবে বয়স্ক মানুষেরা বেশি আক্রান্ত হয়েছেন কোভিড ১৯-এ আর তাঁদের অনেকেই ঢলেও পড়েছেন মৃত্যুর কোলে–তা আজ আমরা সবাই জানি। কী অবস্থা হয়েছে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের, জানি তাও। করোনার করালগ্রাসে কীভাবে চাকরি খুইয়েছেন বেসরকারি সংস্থার কর্মীরা­–সংবাদের শিরোনাম হয়েছে তাও। কিন্তু তেমন কথা বলা হয়েছে কি সেইসব মানুষদের নিয়ে যাঁরা শিল্পী, মানে যাঁরা সঙ্গীত, নৃত্য পরিবেশন করেন, মঞ্চ বা স্ক্রিন মাতান শরীর আর কন্ঠ সঞ্চালনে?  এঁদের মধ্যে যাঁরা ‘প্রফেশনাল’, মানে পেশাদার তাঁদের অবস্থা কিন্তু বেশ খারাপ। অনেকেরই একের পর এক শো ক্যানসেল হয়েছে। যাঁরা খানিকটা সচ্ছল, নামী শিল্পী, তাঁরা অনেকেই এই ধাক্কা কিছুটা হয়তো সামলেছেন সঞ্চয়ের ওপরে নির্ভর করে, কিন্তু মাচার শো করে যাঁরা জীবিকানির্বাহ করেন, তাঁদের অবস্থা হয়েছে সঙ্গিন। তবু এরই মধ্যে যাঁরা সঙ্গীত বা নৃত্যশিল্পী তাঁরা কিছুটা, উদ্যোগী হলে, উপার্জন করতে পারবেন নানা অনলাইন মাধ্যমকে ব্যবহার করে। কেউ কেউ এই প্ল্যাটফর্মগুলিকে উপার্জনের জন্য ব্যবহার করতেও শুরু করেছেন। পরস্থিতির যদি উন্নতি না-হয়, এই মাধ্যমগুলির ব্যবহার সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে বাড়বেই। করোনা দেখিয়ে দিয়েছে যে, ঘরে বসেই ‘লাইভ’ সঙ্গীতানুষ্ঠানের স্বাদ অনেকখানি মেটানো সম্ভব। কিন্তু মোবাইল ফোনে নাটকের স্বাদ কি নেওয়া যাবে? নেওয়া সম্ভব?

            অনেকেই বলবেন যে, সিনেমা আর টিভি সিরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত মানুষরাও তো একইভাবে ভুগছেন। ঠিকই। এইসব পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের একজন-দু’জন ইতিমধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন। তবুও বলা যেতে পারে যে, আগামী কিছুদিনের মধ্যেই যদি শুটিং শুরু হয়, তাহলে সিনেমা আর টিভি সিরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা  অন্তত কিছুটা এই সংকট থেকে পরিত্রাণ পাবেন। কেননা, এই দু’টি মাধ্যমেই টেকনোলজির সাহায্য নিয়ে ‘সামাজিক দূরত্ব’ (আমার আগের দিনের ব্লগের লেখা পড়ে যদিও অনেক পাঠকই জানিয়েছেন যে, এই শব্দবন্ধটিও গভীরভাবে ‘রাজনৈতিক’ এবং ভালো হয় এর পরিবর্তে ‘শারীরিক দূরত্ব’ এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করলে, তবুও যেহেতু এটিই আপাতত আমজনতার মধ্যে গৃহীত হয়ে গেছে, তাই পাঠকদের যথার্থ আপত্তিকে স্বীকৃতি দিয়েও এই শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করলাম) মেনে শিল্প সৃষ্টি সম্ভব। আর এই শিল্পের ভোক্তা যাঁরা তাঁরা, প্রকৃতিতে, নাটকের দর্শকের চেয়ে আলাদা। যেমন বেশ কিছুদিন ধরেই সিনেমা হলে যাওয়ার বদলে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের একটি অংশ। আর টিভি সিরিয়াল তো জানলার ফাঁক দিয়ে ভেতরে চলে আসা নির্ভীক পাখি যে বাসা বেঁধে নেয় গৃহস্থের ঘরের কোণে। সভ্যতা করোনা-আক্রান্ত হওয়ার আগেও তো একটি অভিযোগ শোনা যেত যে, টিভি সিরিয়ালের কারণেই নাটকের দর্শক কমে যাচ্ছে। শুটিং শুরু হলে, তাই, টিভি সিরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত পেশাদার শিল্পী ও টেকনিশিয়ানসরা সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলেই মনে হয়। আগামিতে নতুন মাধ্যমে সিনেমা বানিয়ে অনলাইনেই সেই সিনেমাকে রিলিজ করার প্রবণতাও বাড়বে। তবে এতে এই শিল্পটির সঙ্গে যুক্ত একেবারে নিচু তলার কর্মীদের কতখানি লাভ হবে সে প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়।

            কিন্তু, করোনার আঘাতে সব থেকে বেশি বিপর্যস্ত হবে থিয়েটারই।  যাঁরা পেশাদার থিয়েটার কর্মী ও শিল্পী, তাঁরা যে স্তরের বা মানেরই হোন না কেন, তাঁদের পক্ষে করোনার চ্যালেঞ্জটা মোকাবিলা করা খুবই কঠিন। ‘সামাজিক দূরত্ব’বিধি মেনে টিভি সিরিয়াল বা সিনেমা বানানো গেলেও, ‘থিয়েটার’ বানানো কার্যত অসম্ভব। আর এই বিধি উঠে গেলে, থিয়েটারের জন্য হল দেওয়া শুরু হলেও, মানুষ ভয়কে জয় করে আগামী এক বছর (কিংবা হয়তো বা তারও বেশি সময় ধরে) থিয়েটার দেখতে যাবেন তো? কলকাতা হোক বা মফস্‌সল, থিয়েটারের মূল দর্শক মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্ত বাঙালি। নানা কারণেই কোভিড ১৯ নিয়ে এঁদের অনেকেই আতঙ্কিত। আর যাঁরা আতঙ্কিত নন, তাঁরাও জীবিকানির্বাহের জন্য যেটুকু কাজ করতে হবে তার বাইরে গিয়ে কোনও জনসমাগমেই অংশ নিতে মানসিক সায় পাবেন তো? বলা যেতে পারে যে, থিয়েটারও তো অনলাইন মোডে সুইচ ওভার করলেই পারে! হ্যাঁ, একটি-দু’টি সেই ধরনের প্রচেষ্টা দেখেছি বই কী! কিন্তু মনে হয়েছে যে, এই মাধ্যমটিতে থিয়েটারের সফল হওয়া মুশকিল। মুশকিল কারণ থিয়েটার এমন একটি শিল্প যার প্রাণ হল দর্শকের সঙ্গে  অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সরাসরি সংযোগ। সিনেমা বা টিভি সিরিয়ালের থেকে এখানেই তো থিয়েটার আলাদা। দর্শকের একটি দু’টি মন্তব্য, করতালি না-পেলে বড় অভিনেতারও অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ হয় না! আর দর্শক? সমবেত উপভোগ না-হলে থিয়েটার জমে, হয় নাটকের প্রকৃত রসগ্রহণ? এ তো আর বাড়ির কোণে বসে সান্ধ্য চা সহযোগে মজে থাকার শিল্পবস্তু নয়!

            জানি না এই সংকট থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাবে থিয়েটার। থিয়েটার কর্মীদের সাহায্য করার জন্য খুব বেশি উদ্যোগ কিন্তু এখনও পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। এমনকি যেভাবে আমরা বইপাড়ার জন্য ঝাঁপিয়েছি, সেইভাবে পেশাদার থিয়েটারকর্মীদের জন্য ঝাঁপাইনি।

            অনেকে বলতে পারেন যে, যাত্রারও তো একই হাল হবে। ঠিক। তবে, যাত্রার ক্ষেত্রে ভরসার দিক একটিই। এই শিল্পমাধ্যমটির মূল ভোক্তা এখনও মূলত গাঁ-গঞ্জের নিম্নবিত্ত মানুষ।  যদি করোনা আগামী ছ’মাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রণে আসে, তবেই যাত্রাশিল্পটি নাটকের চেয়ে একটুখানি ভালো অবস্থায় থাকতে পারে। এই কথাটি লিখেই মনে হল যে, এতগুলি শিল্প মাধ্যমের মধ্যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাগ করে এর দুঃখ বেশি, ওর দুঃখ কম বলছি বটে  তবে কে না জানে যে, অশ্রুর কোনও শ্রেণিবিভাজন হয় না!

শেষে একটি কথা। যাঁরা পেশাদার নন, থিয়েটার করে যাঁদের রুটি জোটে না, কিন্তু মঞ্চের আলোর মায়া, দর্শকদের হাততালি যাঁরা ঝিনুকের মতো নিদারুণ কষ্টের শক্ত খোলার ভেতরে মুক্তোর মতো জমা করেন অন্তরে উজ্জ্বল থাকবেন বলে, বেঁচে থাকাকে একটু সহনীয় করে তুলবেন বলে, যদি দীর্ঘদিন মঞ্চে এঁরা না-নামতে পারেন, সেই অভাব এঁদের তিরের মতো বিঁধবে। সারাদিন খবরের কাগজ বিক্রি করে যিনি মঞ্চে নামেন অভিনয় করবেন বলে, কারুবাসনা যাঁদের বিলাস নয়, নিয়তি, থিয়েটার যাঁদের রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছে অক্সিজেনের মতো, পরিস্থিতির উন্নতি না-হলে কোনও ডাক্তারবাবু তাঁদের বাঁচাতে পারবেন কি?

করোনার প্রত্যক্ষ আঘাতে মারা যাচ্ছেন অনেকে। অপ্রত্যক্ষ আঘাতেও ট্রেনের তলায় কাটা পড়ছে শরীর, সিলিং থেকে তা ঝুলে পড়ছে কখনও। কিন্তু কোভিড ১৯-এর কারণে যে প্রতিদিন ভেন্টিলেটরে চলে যাচ্ছে কত কত মন, তার খবর কে রাখে?


                                                                                               

                                                                                                                             অংশুমান কর

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা



Wednesday, May 27, 2020

‘পরিযায়ী’ শ্রমিকদের বাসায় ফেরা কতটা খারাপ করবে করোনা পরিস্থিতি?

বাসায় ফিরতে শুরু করেছেন ওঁরা। ওরা মানে ‘পরিযায়ী’ শ্রমিকেরা। এতদিন বাসায় ফিরছিলেন পায়ে হেঁটে, সাইকেলে। হয় ট্রেন চলেইনি, নয়তো ট্রেনের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল।  এবার বেড়েছে ট্রেনের সংখ্যা। বাড়ি ফিরছেন ওঁরা। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আতঙ্ক। থাবা বসাচ্ছে কোভিড ১৯। বাড়ছে করোনা আক্রান্তর সংখ্যা। যে কোভিড ১৯ ভাইরাস এতদিন আটকে ছিল মূলত শহর আর শহরতলিতে, তা এবার ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামে-গঞ্জেও। ‘গ্রিন জোন’ আর ‘গ্রিন’ থাকছে না। ‘গ্রিন জোনে’র তকমা খুইয়ে বাড়ছে হা-হুতাশ। সেইসব হতাশ্বাস শোনা যাচ্ছে ফেসবুক জুড়ে।

            লেখা এগোনোর আগে দু’টি কথা এখনই বলে নেওয়া দরকার। প্রথম কথাটি হল এই যে, ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ এই শব্দবন্ধটি ব্যক্তিগতভাবে আমার একেবারেই পছন্দ নয়। কিছুদিন আগেই একটি লেখায় আমি সওয়াল করেছিলাম ‘কেরালা’ বা ‘ওড়িশা’ সরকারের মতো এই শ্রমিকদের ‘অতিথি শ্রমিক’ বলা হোক। কাজের সন্ধানে যে গরীব মানুষেরা ভিন রাজ্যে যান, তাদের যত সহজে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ বলা যায়, তত সহজে ভিন রাজ্যে করপোরেট সংস্থায়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে যাওয়া আমাদের মতো ‘বাবু’দের ‘পরিযায়ী’ ম্যানেজার, অফিসার বা অধ্যাপক বলা যাবে তো? বিশ্বাস নেই, তবু এই ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করছি কারণ ‘অতিথি শ্রমিক’ শব্দবন্ধেও অনেকের আপত্তি আছে আর ‘অতিথি শ্রমিক’ বা এই ধরনের অন্য কোনও শব্দবন্ধ ব্যবহার করলে হয়তো অনেকে ধরতেই পারবেন না ঠিক কাদের কথা বলতে চাওয়া হচ্ছে।

            দ্বিতীয় কথাটি শেষে বললেও চলত। কিন্তু শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো। ‘পরিয়ায়ী শ্রমিকরা’ বাসায় ফেরায় যাঁরা আতঙ্কিত হচ্ছেন ‘গ্রিন জোন’ ‘গ্রিন’ থাকছে না বলে বা করোনা এবার ঘরের দুয়ারে চলে এল বলে তাদের হা-হুতাশ বা আতঙ্ককে ছোট করতে চাইছি না মোটেই। যে-জেলায় আমার বাস, সেই পূর্ব বর্ধমান দীর্ঘদিন ‘গ্রিন জোন’ ছিল। তারপরে ‘অরেঞ্জ জোন’ হল। পাওয়া গেল একজন করোনা-আক্রান্তকে। সেইদিন সত্যি বলতে কী, আমারও তো একটু খারাপই লেগেছিল। কিন্তু, সে-খারাপ লাগা ছিল সাময়িক। তার স্থায়িত্ব কয়েক ঘন্টাও হয়নি। তবে যেহেতু ‘গ্রিন’ থেকে ‘অরেঞ্জ’ হয়ে আমার নিজেরও প্রথমটা একটু খারাপই লেগেছিল, তাই অন্যদের হা-হুতাশ বা আশঙ্কাকে ছোট করতে আমি চাই না। তবে, তারপরেও কতগুলি কথা বলার থাকেই।

            আজ আমরা প্রায় সকলেই বুঝে গিয়েছি যে, পৃথিবী  দ্রুত করোনা-মুক্ত হবে না। এত সহজে আবিষ্কারও হবে না (বা আবিষ্কৃত হলেও দ্রুত ব্যবহার করা যাবে না) কোভিড ১৯ -এর ভ্যাকসিন। বেশ স্পষ্ট হয়েছে যে, করোনার সঙ্গেই আমাদের ‘ঘর’ করতে হবে এইবার। এই মুহূর্তে হঠকারী সিদ্ধান্ত যেমন নেওয়া যাবে না, নিতে হবে ব্যক্তিগত বিজ্ঞানসম্মত সুরক্ষা, তেমনই হওয়া যাবে না অমানবিকও। আর এটাও বোধহয় বুঝে নেওয়া ভালো যে, লক ডাউন যে-অবস্থায় এসে আজ দাঁড়িয়েছে, তাতে লক ডাউনের শুরুতে ‘গ্রিন জোন’, ‘রেড জোন’ বা ‘অরেঞ্জ জোন’-এর যে মাহাত্ম্য ছিল, আজ আর তা নেই। অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে যাতে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা না-বাড়ে। তবে এই পরিস্থিতিতেও অযথা ভয় পেলে চলবে না। ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের বাসায় ফেরা নিয়েও কারণ না-থাকলে আতঙ্কিত হওয়াও উচিত হবে না।

            সত্যি বলতে কী, যে-মানুষগুলো ভিন্ন রাজ্যে আছেন, যাদের কাজ নেই, কেন্দ্র সরকার যাদের পকেটে সরাসরি পয়সা না-দিয়ে দিচ্ছে চাল আর ডাল, মানে শুকনো রেশন, তাঁরা যদি এই অসহনীয় অবস্থায় বাড়ি ফিরতে চান, তা কি অপরাধ? তাঁরা যদি পেতে চান আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গ, যা কিছুটা হতে পারে ক্ষতের মলম, তা কি খুব বেশি চাওয়া? অথচ, এই মানুষগুলো বাড়ি ফিরে সবসময় সেই ব্যবহার পাচ্ছেন না, যা তাঁরা আশা করছেন সমাজের কাছে। পরিসংখ্যান যা বলছে তাতে, এঁদের  অনেকেই কোভিড ১৯ পজিটিভ হচ্ছেন বটেই, তবে সেই শতাংশও কিন্তু এখনও এমন অঙ্কে পৌঁছয়নি যাতে ভিন রাজ্য থেকে আসা একজন পরিযায়ী শ্রমিককে দেখলেই মনে হবে যে, ইনি করোনা-আক্রান্ত, তাই অস্পৃশ্য। এই অস্পৃশ্যতাকে অবশ্য আমরা শ্রেণি-নিরপেক্ষভাবেই সমাজে বিষফোঁড়ার মতো জন্ম নিতে দেখেছি। অনেকেই  ইতিমধ্যেই ফেসবুকে লিখেওছেন সেই অভিজ্ঞতা। করোনা-আক্রান্ত হলে তো কথাই নেই, এমনকি কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষজনকেও আমাদের অনেকেই অস্পৃশ্য ভেবেছি! ভেবে দেখিনি আমাদের আচরণ তাদের মনের ওপরে কী ভয়ংকর চাপ তৈরি করেছে। এই একই ধরনের ব্যবহার, যা খবর পাচ্ছি তাতে বুঝতে পারছি, ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দেরও অনেকেই পাচ্ছেন; কেবল শহরে না, গঞ্জে এবং গ্রামেও। লকডাউনের ফলে এই মানুষ গুলো কষ্ট করেছেন সবচেয়ে বেশি। আগামী দিনও খুবই কঠিন হবে এই মানুষগুলোর জন্যে। এত কষ্ট আর যন্ত্রণার মধ্যে যখন এঁরা কোনওমতে বাড়ি ফিরছেন, তখন আমরা তাঁদের ফেরার পথে পথে পাথর ছড়িয়ে দিতে পারি কি?

            মানছি যে, এই মানুষগুলো দেশের একটি রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গেলে করোনা ছড়াবে। বিশেষ করে যে-সমস্ত রাজ্যে কোভিড ১৯ আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেই রাজ্যগুলি থেকে যদি এঁরা যেসব রাজ্যে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা কম, সেইসব রাজ্যগুলিতে যান, তাহলে সেই রাজ্যগুলিতে আক্রান্তের সংখ্যাবৃদ্ধি হবে। গ্রামেও প্রবেশ করবে করোনা। আমাদের পূর্ব-বর্ধমান জেলাতেও ‘পরিযায়ী শ্রমিক’রা বাড়ি ফেরার ফলে করোনা-আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। যে-জেলার আমি সন্তান, সেই বাঁকুড়া জেলাও আর ‘গ্রিন’ নেই। ওই যে, প্রথমেই বলেছি, এই সংখ্যাবৃদ্ধি অনেকেরই কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলবে। দুশ্চিন্তা বাড়াবে। কিন্তু, তাই বলে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের সঙ্গে বিমাতৃসুলভ আচরণ কি পশ্চিমবঙ্গ করতে পারে?

            কিছু বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। দেখতে হবে যে, বাসায় ফেরার পরে এই ‘পরিযায়ী শ্রমিক’রা নিয়মকানুন মেনে থাকছেন কি না। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকলে দায়িত্ব নিতে হবে রাজ্য সরকারকেই। আর ঘরেই কোয়ারেন্টিনে থাকার প্রয়োজন হলে, প্রতিবেশিদেরই দেখতে হবে শ্রমিকরা থাকছেন কি না গৃহবন্দি। বাইরে বেরোনোর অনুমতি পেলে, পরছেন কি না মাস্ক। প্রশাসনের দায়িত্ব থাকবেই, কিন্তু দায়িত্ব থাকবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদেরও। সতর্ক তাই আমাদের থাকতেই হবে।

            প্রশাসনের কথা যখন উঠলই, তখন দু-একটি অন্য কথাও বলা যেতে পারে। আমফানের জন্য কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের নিয়ে আসা ট্রেন সংখ্যায় ছিল কম। কিন্তু বুধবার থেকে এত ‘শ্রমিক স্পেশ্যাল’ ট্রেন  পশ্চিমবঙ্গে আসতে শুরু করেছে যে, সেই ট্রেনগুলিতে আসা শ্রমিকদের সকলের স্টেশনেই করোনা-পরীক্ষার জন্য লালারস সংগ্রহ  করা কার্যত অসম্ভব। জানা গেছে যে, আগামী কয়েকদিনে রাজ্যের নানা স্টেশনে থেমে হাওড়া স্টেশনে ঢুকবে একাধিক ট্রেন। বেশ কিছু ট্রেন ঢুকবে এনজিপিতে। এতগুলি ট্রেনে আসা ‘পরিযায়ী শ্রমিক’দের চাপ নেওয়া রাজ্য প্রশাসনের পক্ষে খুব সহজ হবে না। সন্দেহ নেই যে, ‘শ্রমিক স্পেশ্যাল’ ট্রেনগুলি চালানোর ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরকার ও রাজ্য সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলির নিজেদের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। একইভাবে যে-ভাবে অনেক ক্ষেত্রেই সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং-এর তোয়াক্কা না-করেই ট্রেন বোঝাই করে শ্রমিকদের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পাঠানো হচ্ছে–সেটিও চূড়ান্ত অবিবেচনার কাজ হচ্ছে। আরও একটি কথা সত্য। পরিকল্পনাহীনভাবে দেশজুড়ে লকডাউনে না-গিয়ে যদি লকডাউন ঘোষণার আগেই পরিকল্পিত উপায়ে এই শ্রমিকদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করা হত তাহলে অনেক প্রাণহানি যেমন আটকানো যেত, তেমনই আজকের এই পরিস্থিতিও হয়তো তৈরি হত না। তবে যা হয়ে গেছে, তার কাঁটাছেড়া চলতে পারে, সমালোচনা চলতে পারে। ভুল যাতে আর না-হয়, তা নিয়ে পরামর্শ দানও করা যেতে পারে। কিন্তু যে ‘ভুল’ একবার সম্পাদিত হয়ে গেছে, তার খেসারত (বিশেষ করে সে ভুল যদি হয় ‘রাষ্ট্রিক’ ভুল) আমাদের দিতেই হয়। 

‘পরিযায়ী শ্রমিক’রা বাড়ি ফিরলে, করোনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, আমাদের রাজ্যেও এর পৃথক চিত্র হবে না–এই সত্য আজ মেনে নিতে হবে। মেনে নিতে হবে এই সত্যও যে, সংক্রমণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হবে। মেনে নিয়েই, সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য যা যা করা উচিত করতে হবে রাজ্য সরকারকে। নিতে হবে সমষ্টিগত ও ব্যক্তিগত উদ্যোগও। কিন্তু, একই সঙ্গে এও মনে রাখতে হবে যে, কষ্টের পাহাড় ডিঙিয়ে বাড়ি ফিরছেন সে ‘পরিযায়ী শ্রমিকেরা’ তাদের যেন আমরা নিজভূমে পরবাসী করে না-দিই।   

                                                                                                            অংশুমান কর

                                                                                      

                                                                                        

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা


Monday, May 25, 2020

আমফানের পরে জল, বিদ্যুৎ, ফোনের নেটওয়ার্ক চেয়ে মধ্যবিত্তরা দোষ করলেন কি?

আয়লার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল আমফান। তাই সে ভয়ংকর ক্ষতি করেছে এ বাংলার। বিধ্বস্ত হয়ে গেছে দুই চব্বিশ পরগণা। সুন্দরবনের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। তিলোত্তমাও আর সুন্দরী নেই। এই লেখা যখন লিখছি তখনও জানি না, কলকাতা শহরের সব অঞ্চলে বিদ্যুৎ, জল এসেছে কি না। ফোনের টাওয়ার পেয়েছেন কি না সকলে।

            এইটুকু বললেই অবশ্য অনেকে বিষম চটে যেতে পারেন। চটে যাওয়ার কারণও রয়েছে বই কী! বিদ্যুৎ, জল আর নেটওয়ার্ক চেয়ে চিৎকার করেছেন যাঁরা, যাঁরা বিক্ষোভ দেখিয়েছেন, তাঁদের বলা হতেই পারে যে, ভেবে দেখেছ কেমন আছে দুই চব্বিশ পরগণার গ্রামগুলো? জল নেমেছে কি সব গ্রাম থেকে? বিদ্যুৎ পৌঁছেছে? কেমন আছে সুন্দরবন? সমুদ্রের জল সেখানে ঢুকে পড়েছে গ্রামে! বিশুদ্ধ পানীয় জল পাওয়া যেখানে হবে এক বড় সমস্যা। শুধু করোনা নয়, আসবে একের পর এক অন্য সব রোগ। অনেকেরই মাথার ওপর ছাদ নেই এখনও। ঘরবাড়ি দুমড়ে গিয়েছে। কোমর-ডোবা জলে দাঁড়িয়ে থালা বাড়িয়ে খাবার জোগাড় করছে শিশু। আর তোমাদের যাদের মাথার ওপর ছাদ রয়েছে এখনও, তারা বিদ্যুৎ-এর জন্য বিক্ষোভ দেখিয়েছ? 

            কথাক’টি ফেলে দেওয়ার নয়। জল, বিদ্যুৎ না-হয় বাদ দিলাম, ফোনের টাওয়ার নিয়ে যাঁরা হা-হুতাশ করেছেন, কোনওমতে একবার নেটওয়ার্ক পেয়েই যাঁরা ফেসবুকে দু’লাইন লিখে জানিয়েছেন ‘নিরাপদে’ আছেন, তাঁরা প্রায় সকলেই মধ্যবিত্ত। অধিকাংশই কলকাতা বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলির বাসিন্দা। চব্বিশ পরগণার গ্রামে বা সুন্দরবনে যে-মানুষগুলো লড়াই করছেন এই ভয়ংকর প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে, যাঁদের লড়াই করতে হবে আরও অনেকদিন, তাঁদের চেয়ে এঁরা তো অনেকখানি নিরাপদেই আছেন। কিন্তু, আমরা কি একবার ভেবে দেখতে পারি বাঙালি মধ্যবিত্তর একটি অংশ এই ভয়ংকর সংকটে এই রকম আচরণ করলেন কেন?

            ভুলে গেলে চলবে না যে, এই প্রলয় বাংলার বুকে আছড়ে পড়ল যখন, তখন লকডাউন চলছে। সাধারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটের ওপর বন্ধ। এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর বিষণ্ণতার মধ্যে দিন কাটছে মানুষের। সেই আতঙ্ক যদি আমফানের পরে কয়েকগুণ বেড়ে যায়, প্রিয়জনদের কোনও খোঁজখবর না-পেয়ে অসহায় লাগতে থাকে কিছু মানুষের, ঘরে থাকে মুমূর্ষু রুগি যার প্রতি মুহূর্তে নানা কারণে বিদ্যুৎসংযোগ প্রয়োজন, তাঁরা যদি নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে না-পারেন, তাহলে তাঁদের কি সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া যায়? বিদ্যুতের কথা যদি বা বাদও দিই, জল ছাড়া কি জীবন চলতে পারে এক মুহূর্তও? তবে ফোনের নেটওয়ার্ক? সে কি এতখানি গুরুত্বপূর্ণ? সে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, অভ্যেস। আর এর ব্যবহারিক প্রয়োজনও সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় কি? চাই বা না চাই মোবাইল ফোন করোনাক্রান্ত পৃথিবীতে আমাদের স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগের বোধহয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই লকডাউনে, যখন, প্রিয়জনেরা আছেন দূরে, তখন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম তো  মুঠোফোনই। নেটওয়ার্ক না-পেয়ে, প্রিয়জনদের খবরাখবর না-পেয়ে, যদি মানুষ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন, তাহলে কি সত্যিই তাঁদের তেমন দোষ দেওয়া যায়? এই উদ্বেগ কি বিলাস? যে-সংকটের কথা এই অংশের মানুষেরা বলেছেন তা কি শৌখিন, নির্মিত?

            কেউ কেউ এমনটা বলেছেন যে, বিদ্যুৎ নেই বলে বিশেষ করে কলকাতার মানুষ যে হা-হুতাশ করেছেন তা বিসদৃশ ঠেকতে পারে একজন গ্রামের মানুষের কাছে। যেখানে আজও অল্প একটু ঝড়-বৃষ্টিতেই ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎ সংযোগ  থাকে না। ভুল নয় কথাটা। একদিক থেকে দেখলে। আমার জন্ম গ্রামে। জীবনের একটা বড় অংশও কেটেছে গ্রামে। আমাদের বাড়িতে ফ্যানই এসেছিল সম্ভবত যখন আমি ফোর বা ফাইভে পড়ি, তখন। তার আগে হাতপাখার বাতাসই ছিল ভরসা।  ফ্যান আসার পরেও তা শূন্য থেকে ঝুলতে থাকা এক অলীক সৌন্দর্যের মতো ঘরের শোভা বর্ধন করত অনেক সময়েই। হ্যাঁ, ঠিক, অল্প ঝড়-বৃষ্টিতেই বিদ্যুৎ থাকত না এক-দু’দিন। এখন আর গ্রামে থাকি না। কিন্তু সারা বছর গ্রামের মানুষ যে বিদ্যুৎ পান সবার পরে, শিল্প আর শহরের চাহিদা মিটিয়ে তবে যে গ্রামে যায় বিদ্যুৎ–তা জানি। আজও যে বিদ্যুৎ নিয়ে গ্রামের মানুষের ভোগান্তি স্বাভাবিক সময়েই শহরের মানুষদের চেয়ে বেশি–একথা সত্য। ছেলেবেলায় ঘন্টার পর ঘন্টা বিদ্যুৎহীন জীবন কেটেছে। কিন্তু, আজ কি সত্যিই দিনের পর দিন পারব কাটাতে বিদ্যুৎবিহীন জীবন?

            তবে একথা ঠিক যে, জল আর বিদ্যুতের দাবিতে যাঁরা বিক্ষোভ করেছেন, তাঁদের জল আর, বিশেষ করে বিদ্যুৎ পরিষেবা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছিলেন যাঁরা, তাঁদের কষ্টটিকেও স্মরণে রাখা উচিত ছিল। বিদ্যুৎকর্মীদের উপরে চড়াও হয়েছেন যাঁরা তাঁরা অন্যায় করেছেন। ভুলে গেছেন যে, হয়তো এই বিদ্যুৎকর্মীদেরও নিজেদের বাড়িতে তখন আলো নেই যখন তাঁরা অন্যদের বাড়িতে আলো এনে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

            দুই চব্বিশ পরগণার গ্রাম আর সুন্দরবনের মানুষের ভোগান্তি আর যন্ত্রণার সঙ্গে কলকাতা আর তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের ভোগান্তির তুলনা টানা অনুচিত। যত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কলকাতা, তত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায়, চাইলেও, ফিরতে পারবে না গ্রাম। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, শহরের মানুষদের আতঙ্কের কোনও কারণ ছিল না। মধ্যবিত্ত মানুষ আমফান-পরবর্তী সময়ে যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তাকে তাই বিশ্লেষণ করতে হবে তাদের শ্রেণিগত অবস্থান থেকেই। আর খেয়াল করলে দেখবেন যে, এই অংশের মানুষদের একটা অংশ কিন্তু যুদ্ধকালীন তৎপরতার সঙ্গেই মাঠে নেমে পড়েছেন দুই চব্বিশ পরগণা আর সুন্দরবনের মানুষের জন্য ত্রাণ সংগ্রহে। অর্থ থেকে জামা-কাপড় অনেক কিছুই তাঁরা সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। পাশে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন নিজেদের চেয়েও যাঁরা অনেক বেশি বিপন্ন তাঁদের।

            বিপর্যয় বারেবারে পৃথিবীতে সংযোগ আর সহমর্মিতার নতুন ভাষ্য নির্মাণ করেছে। মুদ্রার তো দু’টি পিঠই থাকে। তাই না? 

                                                                                                                          অংশুমান কর


ছবি ঋণঃ গুগল।



রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর

বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্ত...