Thursday, June 25, 2020

গাঁধীকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা


গাঁধী ও কবিতা

কে. সচিদানন্দন


গাঁধীকে এক ঝলক দেখবে বলে

একদিন একটা রোগা কবিতা

গাঁধীর আশ্রমে পৌঁছে গেল।

রামের দিকে তাকিয়ে গাঁধী

তখন চরকায় সুতো কাটছিলেন

তার দরজায় অপেক্ষা করতে থাকা

কবিতাটিকে তিনি নজরই করলেন না

কবিতাটা লজ্জা পেল সে কোনও ভজন ছিল না বলে

 

কবিতাটা একটা গলা খাঁকারি দিল

আর গাঁধী আড়চোখে তাকে দেখলেন

সেই চশমা দিয়ে যে চশমা

দেখেছে নরক।

“তুমি কি কখনও সুতো কেটেছ?”, তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“কখনও টেনেছ মেথরের গাড়ি?

কখনও সহ্য করেছ

খুব ভোরের রান্নাঘরের ধোঁয়াকে?

তুমি কি কখনও থেকেছ বুভুক্ষু?”

#

কবিতাটা বললঃ “আমি জন্মেছিলাম

জঙ্গলে, এক শিকারির মুখে।

এক জেলে আমাকে এই কুটির অব্দি নিয়ে এসেছে।

কিন্তু তবুও, আমি কোনও কাজ জানি না, আমি কেবল গান গাই।

প্রথমে আমি রাজসভায় গাইতাম

তখন আমি হৃষ্টপুষ্ট আর সুদর্শন ছিলাম,

কিন্তু আমি এখন পথে পথে ঘুরে বেড়াই,

অর্ধভুক্ত”

#

একটা সেয়ানার হাসি হেসে গাঁধী বললেন,

“তাও ভালো। কিন্তু তোমাকে

এই মাঝে মাঝে

সংস্কৃতে কথা বলার অভ্যেস

ছাড়তে হবে

মাঠে যাও, কৃষকের ভাষা

শোনো”

#

কবিতাটা একটা শস্যের দানা হয়ে গেল

আর মাঠে অপেক্ষা করতে লাগল

কখন চাষি এসে নতুন বর্ষণে সিক্ত

কুমারী মাটিকে উৎক্ষেপ করবে।

 


অনুবাদ: অংশুমান কর


ব্যবহৃত কবির ছবিটি কবির সৌজন্যে পাওয়া

 

 


Wednesday, June 24, 2020

লকডাউনে লেখা কবিতা-১


ধার-বাকির জীবন

ধারের ওপরেই চলছে জীবন।

বাঙ্কের কাছে হাত পাতি

ব্যাঙ্ক ধার দেয়।

জীবন বিমা নিগমের কাছে হাত পাতি

মেলে কিছু।

বন্ধু-বান্ধবদের বলি, দাও ভাই

দু-তিন মাসের মধ্যে শোধ করে দেব,

ফেরায় না কেউ।

ধার-বাকিরই জীবন।

চলে যায় এভাবেই।

এমনকি

গাছ, জল, মাটিও

শোধ দিতে পারব না জেনেই

একদিন ধার দেয় শক্তি,

একদিন সৌন্দর্য।

শুধু এই অসময়ে

লজ্জায় 

কারও কাছে কিছুতেই চাইতে পারছি না

তরতাজা একটি মন।

 

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


Monday, June 22, 2020

একজন গুলবাজ মানুষের গল্প






গুল মানে ঢপ দেন যেসব মানুষেরা তাঁদের নিয়ে নানা রকমের গল্প চালু আছে। বাংলা সাহিত্যের চরিত্রগুলির মধ্যেও আছে এই রকম গুল দিতে পারা নানা বিখ্যাত পুরুষ ও মহিলা। এঁদের মধ্যে কেন জানি না সেই কোন ছেলেবেলায় পড়া “তাসের ঘর” গল্পের শৈলর জন্য আজও মাঝে মাঝে আমার মন কেমন করে। সে এক অন্য প্রসঙ্গ। আজ বলব এমন একজন মানুষের কথা যাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। যে ছিল আমাদের একান্নবর্তী পরিবারেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

        এই মানুষটির সম্বন্ধে ইচ্ছে করেই ‘যাঁকে’ শব্দটি ব্যবহার করলাম নাচন্দ্রবিন্দু শুধু তো  সম্ভ্রমের নয়, কখনও কখনও  দূরত্বেরও প্রতীক। সাধনদার সঙ্গে আমার সেই দূরত্ব ছিলই না যাতে ওকে আমি আপনি আজ্ঞে করতে পারি। আমি ওকে বলতাম ‘তুমি’; ও আমাকে বলত, ‘তুই’এই মানুষটি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। বছর দুয়েক আগে হঠাৎই মারা যায় সাধনদা। নিজের গ্রাম থেকে দূরে থাকার কারণে ওর মৃত্যুর খবরই পেয়েছিলাম সাধনদা চলে যাওয়ার পরে। একটি কবিতা লিখেছিলাম ওকে নিয়ে।। সেটি প্রকাশ পেয়েছিল সে-বছরের শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকায়। অনেকে হয়তো পড়ে থাকবেন সে-লেখা। নাম ছিল ‘একটি পাড়াগাঁর রূপকথা’

        কবে যে সাধনদা এসেছিল আমাদের বাড়িতে, কী উপলক্ষ্যে, তা আজ আর মনে পড়ে না। তবে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান হলেই ও হাজির হয়ে যেত। থাকত আমাদের গ্রাম বেলিয়াতোড় থেকে অল্প কিছু দূরের একটা ছোট্ট গ্রামে। বিয়েবাড়ি মানে সাধনদা, অন্নপ্রাশন মানে সাধনদা, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান মানে সাধনদা। আর দুর্গাপুজোর সময়ে ওর অনুপস্থিতির কথা আমরা তো ভাবতেই পারতাম না। আমার মনে হয় যেন, আমি সেই ছোটবেলাতেও ওকে যেমন দেখতাম, মারা যাওয়ার আগেও ওকে তেমনই দেখেছি। শিরা ওঠা হাত; সামনের কয়েকটা দাঁত নেই। চুল কালো-সাদা শেষের দিকে অবশ্য সবই পেকে গিয়েছিল। বয়স জিগ্যেস করলে বলত তিন কুড়ির চেয়ে কিছু কম। সেটিও বলত প্রায় বছর কুড়ি ধরে।

        নিজের বয়স নিয়ে এই রকম মিথ্যে তো অনেকেই বলে থাকেন। এ আর তেমন আশ্চর্য কী! কিন্তু শুধু এই ধরনের মিথ্যেই ও বলত না। কবিতাটিতে আমি লিখেছিলাম যে, ওর ভিয়েতনাম যাওয়া নিয়ে ও এক মিথ্যে গল্প ফাঁদত। সত্যিই তাই। মাঝে বেশ কয়েকবছর সাধনদার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। একেবারে কর্পূরের মতোই উবে গিয়েছিল ও। বা যেভাবে দিনের আলো ফুটলে নিঃশব্দে মিলিয়ে যায় ভোরের শিশির, মিলিয়ে গিয়েছিল সেইভাবেই। তারপরে একদিন আবার হঠাৎ ভোরের বেলাই ও ফিরে এল। তবে শিশিরে শিশিরে চরণচিহ্ন এঁকে নয়, বেশ হাঁকডাক করে। এবং এসেই ঘোষণা করল যে, ওর যে কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তার কারণ ওকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভিয়েতনাম!

        কিডন্যাপ? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এই গল্প ও যখন প্রথম বলে তখন আমি নেহাতই কিশোর। তারপরেও অনেক অনেক বার এই গল্প বলেছে ও। আমরাও শুনতে চাইতাম বারবার। বলতাম, বলো না, তোমার ওই ভিয়েতনাম যাওয়ার গল্পটা বলো না। সন্ধে নেমে আসার পরে যখন প্রায় প্রতিদিনই ‘কারেন্ট’ কেটে যেত, আর অন্ধকার নামে এক সর্বগ্রাসী দানোর আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য ঘরে জ্বলে উঠত লব-কুশের মতো অমিত সাহসী দুই ছোট্ট হ্যারিকেন, দেওয়ালের গায়ে নড়ত চড়ত আমাদের নিজেদের থেকেও লম্বা ছায়া, তখন সাধনদা বলত কীভাবে একজন মানুষ ওকে চাকরির লোভ দেখিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ভিয়েতনাম। আমাদের ছায়ার দোলাচলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুলত ওর কন্ঠস্বর–চড়ায় উঠত, খাদে নামত।

ভিয়েতনামে ওর চাকরি জুটেছিল এক ব্রথেলে। রোজগার হত ডলারে। আমি জিগ্যেস করতাম, ভিয়েতনাম দেশটা কোথায় তুমি জানো? বলত, খুব ধুরে (দূরে) লয়। তারপর বর্ণনা দিত ব্রথেলের। তার খরিদ্দারদের। কত বিচিত্র তাদের পেশা আর ধরন–বলত সেইসব কথা। ওর কথা শুনে আমাদের মনে হত আমরা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সব! জিগ্যেস করতাম, ভিয়েতনাম থেকে তুমি ফিরলে কী করে? বলত এক বাঙালি পুলিশ অফিসারের কথা! তিনি নাকি কাজ করতেন ভিয়তনামের পুলিশ ফোর্সে! খরিদ্দার ছিলেন ওই ব্রথেলের। তিনিই ওকে উদ্ধার করে প্লেনের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দেন বাড়ি। আমি জিগ্যেস করতাম, বলো তো প্লেনের ভেতরটা কেমন? তখন আর বলতে পারত না। রেগে যেত। বুঝিয়ে দিত যে, ওকে বিশ্বাস করাই আমাদের কর্তব্য। ও ‘গুল’ দিচ্ছে না। বলত যে,  আমাদের যখন এত অবিশ্বাস তখন ও আর কোনওদিন বলবে না ওর ভিয়েতনাম যাওয়ার গল্প। কিন্তু বলত, একটু উসকে দিলেই ও বলত সেই গল্প। যার আদলটা মোটামুটি একই থাকত আর পালটে পালটে যেত খুঁটিনাটি বর্ণনা।

        এখন ভাবি যে, কেন সাধনদা ওই রকম একটা ব্রথেলের গল্প বলত? এ কি ছিল ওর কোনও যৌন অবদমনের প্রকাশ? ভাবি যে, ও কি সত্যিই গিয়েছিল ভিয়েতনাম? মাঝে মাঝে মনে হয় যে, হতেও পারে। ডায়াসপোরা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি মানুষ পাচার কীভাবে তৈরি করে এক অন্য জাতের ডায়াসপোরা যার গল্প ঝুম্পা লাহিড়িরা লেখেন না! তাহলে কী সত্যিই সাধনদাও ‘পাচার’ হয়ে গিয়েছিল? ভাবলেই মনে হয়, তাই যদি হবে তাহলে ও ফিরে আসার সময় ওই প্লেনের বর্ণনা দিতে পারত না কেন!  মনে হত যে, ও মিথ্যেই বলছে হয়তো অন্য কারও কাছে শোনা গল্পের মধ্যে গুঁজে দিচ্ছে নিজেকে! আবার পরক্ষণেই মনে হত যে, ওর তো সত্যিই কোনও খোঁজখবর ছিল না বেশ কিছুদিন! তখন ও ছিল কোথায়? বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করত যে, ও হয়তো সত্যিই খুব বড়ো বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল। কপালজোরে উদ্ধার পেয়েছিল।

        মাঝে মাঝেই আমার এই বিষয়টা নিয়ে খোঁজখবর করতে ইচ্ছে করেছে সত্যিটুকু জানার জন্যে। কিন্তু সত্যিটুকু জানা আর হয়নি। বরং আজও মনে পড়ে ওই হ্যারিকেনের আলোয় দেওয়ালে দুলতে-থাকা ছায়ার সামনে বসে ওর ভিয়েতনাম নিয়ে বলে-যাওয়া গল্প। মনে হয় যে, হয়তো ও গুলই দিত। মিথ্যেই বলত। কিন্তু আজ আর মিথ্যের নানা স্তরে লুকিয়ে থাকা বহুবিধ বিচিত্র সামাজিক সত্যকে আতস কাচ নিয়ে খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে না। আজ বুঝি যে, ‘গুল’-এর কেবল সামজিক অভিজ্ঞানই নেই, কোনও কোনও গুল বরং বাস্তবের প্রান্তর যেখানে শেষ হয়ে শুরু হয় বাস্তবের চেয়েও আরও বড় এক বাস্তবের প্রান্তর, সেই দিগন্তরেখায় আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। উঁহু, এই যে বাস্তবের কথা বলছি একে কিন্তু ঠিক ‘পরাবাস্তব’ বলা যাবে না; যা আমার কাছে ‘পরাবাস্তব’, তাই অন্য একজনের কাছে ঘোরতর ‘বাস্তব’।

তাই, আজ ভালো লাগে এইটে ভাবতে যে, সাধনদা ছিল এক কথক, এক শিল্পী। শিল্প তো এক ধরনের মিথ্যেই, যা বাস্তব। এক সোনার বুদ্বুদ।


স্কেচ: দেবাশিস সাহা


Saturday, June 20, 2020

চীন নিয়ে কেন কিছু লিখছি না?

একজন এই প্রশ্ন করেছেন আমাকে যে, চীনের এই ‘ভারত-আক্রমণ’, এই ‘ভারত ভূখন্ড দখল করা’ নিয়ে কেন কিছু লিখছি না? প্রশ্ন করেছেন আজকের যুগের ‘চিঠি’তে, মানে ‘মেসেজ’ করে, ইনবক্সে। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে, একবার রমাপদ চৌধুরী ওঁকে বলেছিলেন যে, ‘বুদ্ধিযস্য’ লেখার সময় ওঁর নামে বারো হাজার চিঠি এসেছে। প্রণবদা গিয়ে দেখেন যে, চিঠি এসেছে মোটে বারোটি। রমাপদবাবু ওঁকে বলেছিলেন যে, মনে রাখতে হবে যে, এক হাজার জন যদি ভাবেন চিঠি লিখবেন তাহলে চিঠি লেখেন মোটে একজন। অর্থাৎ একটি চিঠি =একহাজার চিঠি, তাই প্রণবদার নামে আসা চিঠির সংখ্যা বারো হাজারই। অকাট্য যুক্তি। এই যুক্তিতে আমাকে একজন জানতে চেয়েছেন মানে, আসলে এক হাজার জন জানতে চাইছেন চিন নিয়ে আমি নীরব কেন। তাই দু’এক কথা লিখতেই হয়।

        প্রথমেই বলি যে, করোনার আতঙ্কে যখন গোটা বিশ্ব কম্পমান, তখন সীমান্তে এই অস্থিরতা কি আমি সমর্থন করছি? সমর্থন করছি চীনের এই আগ্রাসী মনোভাব? এক কথায় উত্তর হল, না। যে-জওয়ানরা শহীদ হলেন, তাঁদের প্রতিও অন্তরের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অসীম। সারা বছর এঁরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকেন বলেই আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমোই। আর যারা এই লড়াইয়ে শহীদ হলেন, কতখানি ক্ষতি হল তাঁদের পরিবারের, মা-বাবা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যার ভাবলেই মন বিষণ্ন হয়ে পড়ে।

        কোনও প্রশ্ন নেই যে, দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপোস করা যাবে না। কিন্তু চিনা সেনারা যে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে ভারতের সীমানার দিকে, যে-কোনও সময়ে ঢুকে পড়বে সীমানার এপারে, কেউ কেউ বলছেন, সেই খবর নাকি পাওয়া গিয়েছিল অনেকদিন আগেই। আবার কেউ কেউ বলছেন যে, এ হল ভারতের গোয়েন্দা ব্যর্থতা! খবর ছিল না। এই প্রশ্নও কেউ কেউ  তুলেছেন, যখন জানা গেল এই আগ্রাসনের কথা, তখনই কেন উপযুক্ত স্তরে দ্বিপাক্ষিক কথা শুরু হল না? এরই মধ্যে আবার জানা গেল যে, চিনা সেনার ভারতের মাটিতে এক ইঞ্চিও নাকি প্রবেশ করতে পারেনি। বিশ্বাস করুন, আমি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত! কী লিখব?

        আর রইল দেশ জোড়া চিনা-পণ্য বয়কটের ডাক। বেশ কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন দিয়েছে এই ডাক। ডাক দিয়েছেন সাধারণ মানুষেরাও। তাঁদের অনেকেই চিনা পণ্য পুড়িয়েছেন। টিভি ছুড়ে আছড়ে কেউ ফেলেছেন রাস্তায়। কেউ কেউ বলছেন, চিনকে শাস্তি দিতে গেলে চিনকে অর্থনৈতিক ভাবে বয়কট করতে হবেই। কিন্তু, কেউ কেউ আবার ভিন্নসুরে গাইছেন। বলছেন, কী হবে সেইসব চিনা পণ্যের যা দোকানে দোকানে ইতিমধ্যেই মজুত আছে? সেইসব পুড়িয়ে দিলে তো ছোট ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি! অনেকেই বলছেন যে, ভারতের বাজারে যেভাবে ঢুকে আছে চিন, তাতে ‘বাতিল করো’ বললেই একদিনে চিনকে ভারতের বাজার থেকে বাতিল করা যাবে না! কীভাবে রাতারাতি বাতিল হবে রিয়্যাক্টর, বয়লারের মতো জরুরি যন্ত্র? জীবনদায়ী নানা ওষুধ তৈরির কাঁচামাল? কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-ছেলেটি বা মেয়েটি একটি চিনা স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস করছে, সে এখন দুম করে সেই ফোন পারবে তো ছুড়ে ফেলতে? ঠিক কী যে করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারছি না। প্রশ্ন গুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা বলতেও পারছি না। তো, লিখব কী?

        একটি কথা বললে এখনই ‘দেশদ্রোহী’ বলা হবে, কিন্তু আবেগের সঙ্গে একটুখানি যুক্তি মিশিয়ে যদি ভাবি তাহলে বরং এই প্রশ্ন করা উচিত যে, গত এক দশক বা তারও একটু বেশি সময় ধরে বিশ্বরাজনীতিতে চিন এতখানি শক্তিধর হয়ে উঠল কীভাবে? শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে ও-দেশে বাজেট-বরাদ্দ কতখানি? সেখান থেকে কি আমরা কিছু শিখতে পারি?  কিন্তু ওই যে, এইসব কথা বললেই বলা হবে ‘চিনের দালাল’!

দিন কয়েক আগে খানিক তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করে একটি লেখায় বলেছিলাম যে, ইউরোপে যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে তা চিন থেকে আসা ভাইরাস নয়। এবং করোনা ভাইরাসকে ‘চিনা ভাইরাস’ বলা ঠিক হচ্ছে না। তখনও অনেকজনের পছন্দ হয়নি কথাটা! কিন্তু এখন সংবাদপত্রেই প্রকাশ পেয়েছে এই খবর যে, চিনে ডিসেম্বরেরে শেষ দিকে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই ইতালিতে মিলান ও তুলিন-এ বর্জ্য জলের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল করোনা ভাইরাস!

        এই সব কথা লিখছি বলে কি আমি সত্যিই ‘চিনের দালাল’? সমর্থন করছি আমাদের দেশের সীমান্তে চিনের আগ্রাসী ভূমিকা? প্রস্তুত আছি দেশের সার্বভৌমত্ব বলিদানে? না। একেবারেই না। শুধু আমি না, যাঁদের বলা হয় যে, এঁরা চিনের কোনও দোষ দেখতে পারেন না, তাঁরাও কিন্তু সব বিষয়ে চিনের প্রশংসা করেন না। একটি ছোট বইয়ের কথা এই প্রসঙ্গে বলব। বইটির লেখক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। নাম “স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা”।  এই বইটিতে চিনের সাফল্যকে কেবল বিস্ময়মুগ্ধ দৃষ্টিতেই দেখেননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দেখেছেন মোহমুক্ত দৃষ্টিতেও। বইটির দু’টি অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি। বইটির একটি পর্বের শিরোনাম, ‘চাঁদেরও কলঙ্ক আছে’। সেই পর্বে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন: “চীনের সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ সমস্যা বিশাল সংখ্যক কোটিপতিদের আবির্ভাব। যেহেতু সমাজতন্ত্রের বর্তমান স্তরে চীনের সরকার কিছু পুঁজিবাদী সংস্থাকে স্বীকৃতি দেয়, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তারা পায়, ব্যক্তিগত পুঁজি হওয়া সত্ত্বেও তাদের লভ্যাংশ অথবা মুনাফা নিয়ে তারা এখন কোথায় যাবে? সরকারই বা কী করবে? সরকারি পক্ষে একবার বলা হয়েছে দেশের সবাইকে একসঙ্গে কোটিপতি করা যাবে না, তাহলে কতদিনে করা যাবে? কোটিপতি করাই কি লক্ষ্য? সরকার একবারও বলেনি কাউকেই পুঁজিপতি করা যাবে না। এটি একটি জটিল সমস্যা। শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত নির্ধারণেও মূল প্রশ্ন”। 

        বইটির ‘উপসংহার’-এ শেষ কথাক’টি বলার আগেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন: ‘যে প্রশ্ন আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে তা হল যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লক্ষকোটি সাধারণ চীনা নাগরিকদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তার জবাব কী? লক্ষকোটি নাগরিক যাঁরা রাজনীতির বলয়ের মধ্যে নেই তাঁদের নিজেদের বাড়িতে ঘরে বসে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হতে হয়েছে অজানা অপরাধে। পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন। মেয়েদের চুল কেটে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সংগৃহীত চিত্রশিল্প পোড়ানো হয়েছে। এর কোনও প্রতিকার ছিল না? প্রশাসন কোনও ভূমিকাই পালন করল না, বিচারব্যবস্থাও হস্তক্ষেপ করল না! এই বিষয়টি চীনদেশে ভ্রমণের সময় আমাকে বার বার চিন্তিত করেছে”।

        এই লেখা পড়লে মনে হয় যে, যাঁদের ‘চিনের দালাল’ বলে মনে হয়, তাঁরা আসলে ‘চিনের দালাল’ নাও হতে পারেন! মনে হয় যে, চিনেও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা আমাদেরই মতো সীমান্তে শান্তি চান। দুই রাষ্ট্রের সংঘাত চান না।

        শেষে একটি কথা। এরপর থেকে এই ব্লগে শুধুই যে সাম্প্রতিক সময় নিয়ে গদ্য লিখব, তাই নয়। লিখব অন্য নানা বিষয় নিয়েও। ব্লগটি তো আমার। পাঠক আমায় একটু স্বাধীনতা দেবেন আশা করি।  

 

স্কেচ: দেবাশিস সাহা

 



Friday, June 19, 2020

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে কাজ দিতেই হবে, কিন্তু অন্যের কাজ কেড়ে নয়


হাজারো অসুবিধে অতিক্রম করে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড় অংশই নিজেদের নিজেদের রাজ্যে ফিরেছেন। সে-ফেরা তাঁদের কাছে সুখকর হয়নি। মূল্য চোকাতে হয়েছে সীমাহীন। এবং নিজেদের রাজ্যে ফিরেও তাঁদের দুর্দশা কাটছে না।

        প্রথমে তো এই শ্রমিকদের অনেককেই পড়তে হয়েছিল সামাজিক বাধার সামনে। এই রকম ছবিও আমরা দেখেছি যে, এঁদের কাউকে কাউকে থাকতে হয়েছে গাছে বাসা বেঁধে। অনেককে নিজেদের গ্রামে বা অঞ্চলে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। যাঁরা কোনওমতে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পেরেছিলেন, তাঁদের আবার কখনও বা রাখা হয়েছিল অচ্ছুৎ করে। এইবার এঁরা এক অন্য বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

        অনেকেই এই দাবি তুলেছিলেন যে, এই পরিযায়ী শ্রমিকদের পকেটে সরাসরি কিছু অর্থের যোগান দিতে হবে। সে-কাজ গোটা দেশজুড়ে করা হয়নি। এরপরে দাবি ওঠে যে, এঁদের নিজেদের রাজ্যেই কাজে নিযুক্ত করতে হবে। গ্রামের দিকে যতটা সম্ভব এঁদের যুক্ত করতে হবে একশো দিনের কাজে। শহরাঞ্চলে এঁদের দিতে হবে অন্য কাজ, দক্ষতা অনুযায়ী।  আমাদের রাজ্যে অন্তত এই কাজটি শুরু হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের চাকরি দিতে আলাদা ওয়েব পোর্টাল এবং মোবাইল অ্যাপ চালু করা হচ্ছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এই শ্রমিকদের ‘স্কিল ম্যাপিং’-এর। যাতে এঁদেরকে দক্ষতা অনুযায়ী সঠিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করা যায়। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে নিরন্তর চলতে থাকা কেন্দ্র-রাজ্য কাজিয়ার মধ্যে রাজ্যের এই উদ্যোগটিকে  একটি জরুরি এবং ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবেই আমি অন্তত দেখছি। আশাও রাখছি যে, এই উদ্যোগটি সঠিকভাবে রূপায়িত হবে, শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং দেখা হবে না।

কিন্তু এই কাজটি যেখানে যেখানে শুরু করবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে অন্য  কয়েকটি সমস্যা সামনে আসতে শুরু করেছে। যেমন আমি যে-জেলায় থাকি সেই পূর্ব বর্ধমানের দাঁইহাট পুরসভায় পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি অংশকে শহর সাফাইয়ের কাজে লাগাতে চাইছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। ভাবনাটি সামনে আসতেই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছেন এতদিন পর্যন্ত সাফাইয়ের কাজে যুক্ত থাকা কর্মীদের একটি অংশ। এমন একটি খবরই প্রকাশ পেয়েছে একটি দৈনিক পত্রিকায়।  সাফাই কর্মীদের বিক্ষোভের কারণ কী? তাঁরা আশংকা করছেন যে, তাঁদের একটি অংশকে ছাঁটাই করেই পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করার ভাবনাচিন্তা চলছে। তাঁদের আশংকা যে অমূলক নয় তা বোঝা গেছে দাঁইহাট পুরসভার প্রশাসকের কথাতেও। তিনি বলেছেন যে, বর্তমান সাফাইকর্মীদের একটি অংশ কাজে আসছিলেন অনিয়মিত ভাবে। তাঁদেরই চিহ্নিত করে ‘বসিয়ে দেওয়া’র ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। এরই উত্তরে সাফাই কর্মীদের কেউ কেউ বলেছেন যে, এতদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, করোনার ভয় উপেক্ষা করে যাঁরা কাজ করলেন, তাঁদের ছাঁটাই করা চলবে না। দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির দাবিও তাঁরা তুলেছেন, যা মেনে নিতে রাজি নন কর্তৃপক্ষ।

দৈনিক মজুরি এক্ষুনি বাড়ানো সম্ভব না-হলেও কাজে বহাল-থাকা সাফাইকর্মীদের ছাঁটাই করার সিদ্ধান্তটি কিন্তু সঠিক হবে না। এতে পরিস্থিতি ঘোরালো হতে পারে। কাজে গাফিলতি থাকলে ছাঁটাই করার পরিবর্তে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই আকালের দিনে সরকারে দায়িত্ব এটাই দেখা একজন গরীব মানুষকেও যেন সরকারি কোনও সংস্থার কোনও পদক্ষেপে কাজ না-হারাতে হয়।

এটিও বলতে হয় যে, কাজে বহাল-থাকা কর্মীদের পরিবর্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার ভাবনাটি সঠিক ভাবনা নয়। এতে দুই অংশের গরীব মানুষকে মুখোমুখি লড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা একেবারেই কাম্য নয় এখন।

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে কাজ দিতেই হবে। এই ক্ষেত্রে, চেষ্টা করলে, পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু কাজে বহাল-থাকা শ্রমিকদের পরিবর্তে যদি পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করা হয়, তাহলে শুধু ভাবের ঘরে চুরি করাই হবে না, এক অন্য সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা হবে।

শহরাঞ্চলে বিশেষ করে যা প্রয়োজন তা হল ওই ‘স্কিল ম্যাপিং’ করে দ্রুত এই পরিযায়ী শ্রমিকদের, যতখানি সম্ভব হয়, দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া। প্রয়োজনে কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্রও চিহ্নিত করতে হবে।

অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলেই আমাদের দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে যে-সমস্যা তৈরি হয়েছে তার শেকড় চলে গিয়েছে অনেক গভীরে। চটজলদি এই সমস্যার সমাধান করে হাততালি কুড়োতে গেলে কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। বরং একটুখানি ধীরে চললে, সঠিক পরিকল্পনা করে এগোলে, মন্দ হয় না। ততদিন সরকারগুলির উচিত এই অংশের মানুষদের পকেটে সরাসরি কিছু অর্থ দেওয়া। আর এই কাজে মূলত এগিয়ে আসতে হবে কেন্দ্র সরকারকেই।

শুকনো রেশনে কিন্তু সমস্যার চিঁড়ে ভিজবে না।

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা


Thursday, June 18, 2020

দু'টি কবিতা


খেলাধুলোর থেকে দূরে


হাড় আর মাংস দিয়ে বানানো

এক প্রাচীন পালঙ্কের তলা থেকে

আমি তাকে বের করে আনি।

 

বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে নয়

গ্রীষ্মের উদাস বিকেলে

সুতো ছাড়ি, সুতো ছাড়ি...

 

মাঞ্জাবিহীন ধবধবে একটা সরু সুতো দিয়ে

আমাকে ছুঁয়ে থেকে

একটা আকাশি আকাশে

উড়তে থাকে একফোঁটা ঘন নীল বেদনা

 

আমার ঘুড়ি কাটা পড়েনি কোনওদিন...

 

আষাঢ় শ্রাবণ


এই জন্ম দিচ্ছে আর এই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। মাঝে মাঝেই থাকছে গুম মেরে। কোনও কোনওদিন পাজি পিটারের মতো সবাইকে বোকা বানিয়ে  আকাশে টাঙিয়ে দিচ্ছে রোদ্দুর। আর কোনও কোনওদিন প্রতিটি অশ্রুফোঁটায় মিশিয়ে দিচ্ছে সাদা পাতার মতো সত্য অনুতাপ।

অন্য কোনও মাস নয়। মানুষ আসলে আষাঢ় আর শ্রাবণের মতো।

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


Tuesday, June 16, 2020

সুজয়কে ‘হিজড়ে’ বললেন যাঁরা, তাঁরা আসলে করোনার আগেও মাস্ক পরেই ছিলেন


সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জিকে অপমান করা হয়েছে বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবে। অবশ্য এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রোয়িং ক্লাবের ঘটনাটি রত্নাবলী রায় প্রকাশ্যে আনার পরে সুজয় ফেসবুকে আর একটি পোস্ট দেন সেখানেও দেখা যায়, যে শব্দটি বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবে তাঁর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাঁর একটি কাজের প্রক্ষিতে করা একটি মন্তব্যে। শব্দটি হল, ‘হিজড়ে’। যাঁরা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন সুজয়ের উদ্দেশ্যে তাঁদের ধিক্কার জানাই।

          লেখা এগোনোর আগে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো। সুজয়ের ‘সাপোর্ট’ প্রয়োজন বলে আমি এই লেখা লিখছি না। রত্নাবলী রায় ঠিকই লিখেছেন যে, সুজয় একাই একশো। এই লেখা এই কারণেও লিখছি না যে, সুজয় আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার বেশ কিছু কবিতা ও আবৃত্তি করে থাকে। আমরা দুজনে বেশ কয়েকবার মঞ্চে একসঙ্গে উঠেছি, আবারও উঠব। কিন্তু এইসব ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণে এই লেখা লিখছি না। লিখছি রাগ আর বেদনা থেকে। কেউ যদি জিগ্যেস করেন, সুজয়ের বদলে এ ঘটনাটি অন্য কারও সঙ্গে ঘটলে কি লিখতেন কিছু? জানতে পারলে হয়তো লিখতাম, হয়তো লিখতাম না। কিন্তু আমার অবস্থান একই থাকত। এটা তো ঠিকই যে বন্ধুকে অপমান করা হয়েছে শুনলে আমরা একটু দ্রুতই প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকি।

          কী ঘটেছিল সুজয়ের সঙ্গে? তিনি রোজ বিকেলবেলা হাঁটতে বেরোন। সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে বেরিয়ে তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবের দিকে। সেখানে তাঁর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ক্লাবের দারোয়ানের অনুমতি নিয়েই মাস্ক-পরা, হাতে স্যানিটাইজার থাকা সুজয় ক্লাবের ভেতরে ঢোকেন। এবং সেখানেই তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দেওয়া হয়। বলা হয়, যে তিনি বাথরুমে যেতে পারবেন না, কারণ ক্লাবটি ‘হিজড়ে’দের নয়! শেষমেশ সুজয়কে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় ওই ক্লাবটি থেকে। কলকাতা শহরের এই রকম বেশ কিছু ‘অভিজাত’ ক্লাব মান্ধাতার আমলের ‘ঔপনিবেশিক’ নানা প্রটোকল রক্ষার নামে হামেশাই অপমান করে থাকে সমাজে যাঁরা অন্যভাবে  স্বীকৃত সেই সমস্ত ব্যক্তিদের। কিন্তু এই ঘটনাটি ঠিক সেই জাতের নয়। বাহ, হয়তো সেই জাতেরই যেখানে বুঝিয়ে দিতে চাওয়া হচ্ছে যে, লিঙ্গ পরিচয়ে তুমি ‘স্ট্রেট’ না-হলে এইরকম একটি ক্লাবে তোমার প্রবেশাধিকার নেই।

          সুজয়ের পোস্ট থেকে জানা যায় যে, ‘হিজড়ে’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ওঁদের একটি সাম্প্রতিক কাজের প্রেক্ষিতেও। ‘যুদ্ধজ্বর ও রবীন্দ্রনাথ’ এই বিষয়টি নিয়ে একটি কাজ করেছেন সুজয় ও আরও কয়েকজন। কাজটির ইংরেজি শিরোনাম “The Poet and the Pandemic”। আমি কাজটি দেখেছি। খুবই পছন্দ হয়েছে কাজটি আমার। এই কাজটি সুজয়ের এক বন্ধু হোয়াটস অ্যাপে পাঠান তাঁর এক বন্ধুকে। তিনি উত্তরে লেখেন যে, তিনি এই ‘হিজড়ে’ সুজয়ের কোনও কাজেই আগ্রহী নন। এরপরেও তিনি আরও একটু সংযোজন করেন যে, কাজটির কিছুটা তিনি শুনেছেন এবং কাজটি ‘ক্লিশে’। এরও পরে আরও যোগ করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠিক সবার জন্যে নয়। ভাবা যায়! এই ব্যক্তি, তার মানে, নিজেকে রবীন্দ্রঅনুরাগী ও বোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন এবং সুজয়কে ‘হিজড়ে’ বলতে তাঁর ঠোঁট কাঁপে না। প্রশ্ন জাগে, তিনি কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথ হৃদয় দিয়ে পড়েছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি সেই কতকাল আগে লিখেছিলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’?

          ঘটনাটি নিয়ে কাল রাতে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনিও বললেন যে, তাঁদের পাড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের কিছু যুবক থাকে। তাঁদের নিয়ে মজা করে আনন্দ পান কিছু বয়স্ক মানুষ। আরও বললেন যে, একবার সমকামিতার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তাঁকেও শুনতে হয়েছিল ‘হিজড়ে’ শব্দটি। এক ‘বন্ধু’ই তাঁকে বলেছিলেন, তিনি যে সমকামিতার পক্ষে এত সওয়াল করছেন, তিনি কি ‘হিজড়ে’ নাকি?

এই যে বারবার হিজড়ে বলা হচ্ছে সুজয়কে, বা অন্য কাউকে কাউকে, এতে কি তাঁদের অপমান হচ্ছে? অপমান হচ্ছে ‘হিজড়ে’দের? তাঁদের যাঁরা লিঙ্গ-পরিচয়ে পুরুষ আর নারী–এই বাইনারির বাইরে থাকেন? না, একেবারেই না। বরং এই কাজ যাঁরা করছেন তাঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, ‘ভিন্ন’ কোনও কিছুকেই গ্রহণ করতে তাঁরা অপারগ। তাঁরা আসলে ভেতর থেকে অসহিষ্ণু। একজন মানুষ যে ধর্ম পরিচয়ের মতো লিঙ্গ-পরিচয়েও তথাকথিত ‘স্ট্রেট’দের চেয়ে আলাদা হতেই পারেন–এই বোধটিই তাঁদের নেই। শুধু যে-পুরুষদের ‘আচার আচরণ’ ঠিক ‘পুরুষালি’ নয় বরং খানিকটা ‘মেয়েলি’, তাঁদেরই যে এই অপমানের মুখে পড়তে হয় তা নয়; যে-সব নারীরা একটু ‘পুরুষালি’, আক্রমণ আর বিদ্রুপের লক্ষ্য করা হয় তাঁদেরও।

সুজয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাদু’টি থেকে আর একটি জিনিসও পরিষ্কার হচ্ছে। একজন মানুষকে তাঁর একটিমাত্র ‘পরিচিতি’ (সেটিও সমাজ নির্মিত, সেই ব্যক্তি নিজেই চাইলেও নিজের পরিচিতি নির্ধারণ করতে পারেন না) ব্যবহার করেই মেপে নিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হয় এই সমাজে। আজও। অথচ সেই কতদিন ধরে অর্মত্য সেনের মতো তাত্ত্বিকেরা তো বলেই চলেছেন যে, আমাদের পরিচিতি আসলে একাধিক। আমরা একই সঙ্গে হতে পারি ‘গে’ বা ‘স্ট্রেট’ আবার রবীন্দ্রপ্রেমী বা নজরুল অনুরাগী, ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের সাপোর্টারও। আমরা এই কথা মনে রাখি না, মনে রাখি না। একজন ব্যক্তিকে একটি মাত্র পরিচিতির অন্ধকূপে নির্বাসিত না-করা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই।

বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবের পক্ষ থেকে সুজয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। ক্ষমা না-চাইলেও এই ঘটনায় সুজয় ভেঙে পড়তেন না, আমি জানি। তবে সুজয় ভেঙে না-পড়লেও এই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়লে অন্য কেউ অবসাদের শিকার হতেই পারেন।  ঘটনাটি থেকে এও বোঝা গেছে যে, এমনকি অভিজাত ক্লাবের শিক্ষিত সদস্যরাও হোমোফোবিক। এমনকি রবীন্দ্রপ্রেমী, রবীন্দ্রনাথ যাঁকে উদার করবেন বলেই আমরা আশা করি, তিনিও হোমোফোবিক। বোঝা গেল যে, এঁরা আসলে অনেকের মতো এতদিন মাস্ক পরেই ছিলেন। পৃথিবীতে করোনা আসার বহু আগে থেকেই।     

করোনাকে হয়তো একদিন বশে আনা যাবে। কিন্তু কিছু রোগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালাতে হবে আরও অনেকদিন।


অলংকরণঃ দেবাশিস সাহা


Monday, June 15, 2020

সুশান্ত চলে গেলেন, সাধারণ মানুষদের পক্ষে কিন্তু চেষ্টা করলে আত্মহত্যা এড়ানো সম্ভব


সুশান্তের আত্মহত্যা অনেকের মতো আমাকেও জোর ধাক্কা দিয়েছে। হতবাকই হয়েছি। তারই জেরে লিখে ফেলেছিলাম একটি কবিতা। ব্লগেই। সেই কবিতাটি পড়ে অনেকেই নানা মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত ভাবেও আমাকে জিগ্যেস করেছেন যে, আত্মহত্যা কি এড়ানো সম্ভব, আদৌ, বিশেষ করে তখন যখন একজন মানুষের মনে হয় যে, এই পৃথিবীতে আমার জীবনের আর কোনওই মূল্য নেই? আমার মনে হয় যে, সম্ভব। এটা জেনেই আমি এই কথা বলছি যে, পৃথিবীতে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা করেন, নিজেকে সরিয়ে নেন পৃথিবী থেকে। তবে এটি মুদ্রার একপিঠ। আমার কাছে পরিসংখ্যান নেই। জানি না কেউ এই বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন কি না। কিন্তু, কেন জানি না মনে হয় যে, যতজন মানুষ অবসাদের শিকার হন, তাঁরা সকলে কি আত্মহত্যা করেন? মনে হয়, করেন না। লড়াইয়ের মাঠ ছেড়ে দেন যাঁরা, তাঁদের চেয়ে লড়াইয়ের মাঠে রয়ে যান যাঁরা, দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করেন যাঁরা, তাঁদের সংখ্যা এখনও পৃথিবীতে বেশি।

            কেউ কেউ এমনটা বলেছেন যে, সমাজ খুব নিষ্ঠুর হয়ে গেছে। নৃশংস। সারাক্ষণ অপমান আর হিংসে এই সমাজ আমাদের দিকে ছুড়ে ছুড়ে দেয়। দেয়ই তো। এ খুবই সত্যি কথা। এ অভিজ্ঞতা কমবেশি আমাদের সবারই। কর্মক্ষেত্রে। কর্মক্ষেত্রের বাইরে। নিরন্তর আমাদের এই সব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আমাকেও যেতে হয়। আমি তো মনোবিদ নই। তবে আমি যখন এই রকম পরিস্থিতিতে পড়ি, আমি কী করি, সেইটুকু বলি। আমি তখন নিজেকে বারবার বলতে থাকি যে, সবাই আমাকে অপমান করছে না। ভালোওবাসছে অনেকে। অতীতে বিপদে পাশে দাঁড়িয়েওছে অনেকে। আর মনে মনে আবৃত্তি করতে থাকি রবীন্দ্রনাথের কবিতার ওই লাইনগুলো, “কেউ বা তোমায় ভালোবাসে/কেউ বা বাসতে পারে না যে,/...কতকটা যে স্বভাব তাদের/কতকটা বা তোমারও ভাই,/কতকটা বা ভবের গতিক–/সবার তরে নহে সবাই”এই কবিতাটা আমাকে শক্তি দেয়। আমাকে বোঝায় যে, হয়তো আমিও অনেক সময়ই অন্য মানুষদেরও কষ্টের আর অপমানের কারণ হয়েছি। এই বোধ যখনই আসে, দেখেছি যে, আমি সত্যকে সহজভাবে মেনে নিতে পারি।

            একটা কথা সুশান্তের আত্মহত্যার পর থেকে অনেকেই বলছেন যে, অবসাদ এলে তা যেন আমরা না-লুকোই। অবসাদের কথা আমরা যেন বলতে পারি কাছের মানুষদের। যদি প্রয়োজন হয় যেন যেতে পারি মনোবিদের কাছে। দরকারে ওষুধও খাওয়া যেতে পারে। এতে লজ্জার কিছুই নেই। বরং কখনও কখনও প্রয়োজন, নিঃসন্দেহে। কিন্তু মাঝে মাঝে তো মনোবিদের কাছে গিয়েও সুরাহা হয় না সমস্যার। তাঁরা আমাদের অনেকখানি সাহায্য করতে পারেন। কিন্তু আসল লড়াইটা লড়তে হয় নিজেকেই। বন্ধুবান্ধব বা কাছের মানুষরা ঠিক এখানেই অনেকখানি সাহায্য করতে পারে আমাদের। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে যে, এই রকম প্রাণের কথা বলার বন্ধু আমরা পাবো কোথায়? আজ কারই বা এতখানি সময় আছে যে শুনবে আমার সমস্যার কথা? যাঁরা শোনেন না, দোষ অনেক সময় তাঁদের  নয়। তাঁরা সত্যিই ব্যস্ত থাকেন হয়তো, থাকেন কাজের চাপে। কিন্তু আমার কেন জানি না মনে হয় যে, সমাজ এখনও এমন নিষ্ঠুর হয়নি যে, আমি যদি আমার ঘনিষ্ঠ কাউকে বলি আমার অবসাদের কথা, তাহলে সে মুখ ফিরিয়ে নেবে। অনেক সময়ে আমরা ধরেই নিই যে, আমার কথা কেউ শুনবে না। কিন্তু বন্ধুবৃত্তে  একজন-দু’জন এইরকম মানুষ পাওয়া যাবেই যারা আমার কথা শুনতে প্রস্তুত। তাদের চিনে নেওয়াটাও কিন্তু আমারই দায়িত্ব।  আসলে অনেক সময়ে আমরা নিজেরাই, একটি-দু’টি তিক্ত অতীত অভিজ্ঞতার কারণে, সাধারণীকৃত একটি ধারণায় এসে পৌঁছে যাই। কিন্তু, কথা শোনবার লোক এখনও এই পৃথিবীতে আছে। আছে বলেই যতই নিষ্ঠুর দেখাক ‘সমাজ’কে, এখনও কিন্তু আমরা ‘সমাজবদ্ধ-জীব’ হিসেবেই বেঁচে আছি। ‘সমাজ’কে বাতিল করে দিইনি।  তবে একথা ঠিক যে, সকলকে সব কথা বলা যায় না।

ঠিক এই ক্ষেত্রটিতেই সোশ্যাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই বলছেন যে, এই জগতটি মিথ্যে, বানানো। প্রাণের কথা বলা সম্ভব এই রকম বন্ধু সোশ্যাল মিডিয়াতে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। আমার চেনাজানা বেশ কয়েকজন তরুণ তরুণীর ফেসবুকে আলাপ থেকে সম্পর্ক গড়িয়ে পরিণতি পেয়েছে বিবাহে। ‘ভার্চুয়াল’ মানেই সে ‘অবাস্তব’ আর ‘বানানো’ তা কিন্তু নয়। তাই ফেসবুকের বন্ধুদের বলা যাবে না কষ্টের কথা–এমন সরলীকরণে না-আসাই বোধহয় ভালো। তবে, এইটে হয়তো সত্যি যে, যাঁরা সেলিব্রিটি তাঁদের পক্ষে সবসময় অবসাদের কথা প্রকাশ্যে আনা সম্ভব হয় না। এর নানা কারণও থাকেওই জীবনের মধ্যে গিয়ে আমি পড়িনি। মাঝে মাঝে তাই এই প্রশ্ন জাগে যে, সত্যিই কি ওঁরা একজন দু’জন বন্ধুও পান না জীবনে? জানি না। তবে এই ধরনের ভাবনা মাথায় এলে মনে হয় যে, সাধারণ মানুষ কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই অন্তত দু’একজন এমন বন্ধুকে জীবনে পেতে পারেন যাঁদের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করা যায়।

            শুধু অপমান আর হিংসে নয়, না-পাওয়াও অনেক সময় একজন মানুষকে অসহায় করে তোলে। কিন্তু একজন মানুষ জীবনে যা চান, সবই কি পান? না-পাওয়ার বেদনা যখন আমাকে বিষণ্ণ করে তখন আমি আবারও ভাবি সেই রবীন্দ্রনাথের কথাইশুনি সেই চিরপরিচিত গানটি: “আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে”বুঝি যে, যা পাইনি, সেই না-পাওয়া হয়তো আশীর্বাদ হয়েই এসেছে আমার জীবনে। বুঝি যে, না-পাওয়ারও এক ধরনের রং থাকে। আর আবারও মনে করার চেষ্টা করি, যা পাইনি, তার চেয়ে যা-পেয়েছি জীবনে, সেই জিনিসগুলির সংখ্যা বেশি। তা হয়তো অনেক সময়ে অন্যের কাছে ‘তুচ্ছ’, কিন্তু আমার কাছে তার ‘মূল্য’ অসীম।

            কেউ যদি বলেন যে, এতক্ষণ ধরে যেসব কথা বললাম সেসব কথার কেন্দ্রে তো মধ্যবিত্ত মানুষঠিক। আমার নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কথা বললাম মধ্যবিত্তের অবসাদ নিয়েই। কিন্তু, প্রশ্ন উঠতে পারে যে, একজন গরীব কৃষক যখন ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করছেন, তখন কী করে তাঁকে মুক্ত করা যাবে দুশ্চিন্তা আর অবসাদ থেকে? খানিকটা এই কাজ তাঁর আত্মীয়পরিজন আর বন্ধুবান্ধবরা পারেন। কিন্তু পুরোটা হয়তো পারেন না। কারণ, এই অবসাদ অনেক সময়েই রাষ্ট্রের তৈরি করা। যে রাষ্ট্র অসাম্যকে মদত দেয়, সেই রাষ্ট্রই কৃষককে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। এর বিরুদ্ধে লড়াই করতেই হবে। সে এক অন্য লড়াই।

সমাজকে ‘বাতিল’ করা নয়, ‘পাল্টানো’ তাই জরুরি।  

                                                                                           

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা


Sunday, June 14, 2020

সুশান্ত, তোমার মৃত্যু আমাকে অপরাধী করে দেয়




কোনও কোনও মৃত্যু ফুটে ওঠে

হাসনুহানার মতো

কান্নাকাটির রঙে সে আরও শুভ্র হয়ে ওঠে।

 

কোনও কোনও মৃত্যু

এক পশলা বৃষ্টির স্বস্তির পর

আবার শূন্যতার দুঃসহ গ্রীষ্ম।

 

কোনও কোনও মৃত্যুর পর

দেশ যেন আগ্নেয়গিরি।

 

কিন্তু

 

কোনও কোনও মৃত্যুর পর

শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে যায় বিপাশার শীতল জল

মনে পড়ে

কোন কোন বন্ধুর খোঁজ নিইনি

 

ঠিক কতদিন

 

 

 

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা


Saturday, June 13, 2020

করোনার ভয়ে সেলুনে যাচ্ছেন না মানুষ, বিপাকে সেলুন মালিক থেকে কর্মীরা

সেলুন খোলার অনুমতি মিলেছে। খুলেওছে নানা জায়গায়। কিন্তু করোনার ভয়ে সেলুনমুখো হচ্ছেন না মানুষ।  হবেনও না বেশ কিছুদিন। ভদ্র বাংলায় যাঁদের বলা হয় ‘বার্বার’ (হ্যাঁ, এক শ্রেণির বাঙালির কাছে এটা এখন বাংলাই) আর চলতি বাংলায় যাঁদের বলা হয় ‘নাপিত’, তাঁদের অবস্থাও কিন্তু ভালো নয় একেবারে।
   একথা ঠিক যে, কোভিড ১৯ মানুষকে অনেক কিছু শিখিয়ে নিয়েছে। যাঁরা কোনওদিন ভাবেনইনি নিজেই নিজের গানের ভিডিও বানিয়ে ইউ টিউবে আপলোড করবেন, তাঁরাও ভিডিও এডিটিং শিখে ফেলেছেন নানা সফটওয়্যারে। আমার মতো কোনও কোনও অর্বাচীন যাঁরা জানতামই না কীভাবে বানাতে হয় ব্লগ, কেমন করে হয় তার ডিজাইন, তারাও বন্ধুবান্ধবদের ফোন করে করে বিরক্ত করে, শেষমেশ খুলে ফেলেছে ব্লগ। কিন্তু মানুষ বাড়িতে চুল কাটবে? না, একথা তো করোনা-আক্রান্ত সময়েও প্রথমটায় মানুষ ভাবতেই পারেনি! কিন্তু শেষে যখন লকডাউন গড়িয়ে গেল মাস পেরিয়ে আরও কিছুদিন, তারপরে এক সময় পূর্ণ করে ফেলল হীরক জয়ন্তী দিবস, তখন পারল। অসমসাহসী কেউ কেউ অবশ্য এর আগে থেকেই চুল কাটতে শুরু করেছিলেন বাড়িতে। ফেসবুকে প্রথমে একটি দু’টি, তারপরে একের পর এক ছবিতে দেখা গেল স্ত্রীরা কেটে দিচ্ছেন স্বামীদের চুল। যিনি ভালো গান গাইতেন বা আবৃত্তি করতেন, দেখা গেল তিনি ভালো কাঁচিও চালাতে পারেন। তবে এই বিষয়টি নিয়ে কিছু কুৎসিত মিমও বেরোল। দেখানো হল যে, স্ত্রীরা নাপিত হিসেবে তেমন বিশ্বাসযোগ্য নন। চুল কাটতে গিয়ে কেটে ফেলতে পারেন কানও! এই অপমান গায়ে না-মেখেই স্ত্রীরা চুল কেটে চললেন স্বামীদের। তবে এর উলটো ছবি কিন্তু খুব একটা পাওয়া গেল না। মানে স্বামীরা কেটে দিচ্ছেন স্ত্রীর চুল–নাহ, এমন ছবি আমি অন্তত ফেসবুকে খুব একটা দেখিনি। এর কারণ কি? সেই লিঙ্গ বৈষম্য? স্ত্রীর চুল কেটে দিতে আত্মসম্মানে লেগেছে স্বামীর? নাকি মেয়েদের চুল বড়ো হলেও ক্ষতি নেই, বরং সেটাই দস্তুর–সমাজের মূলে প্রোথিত এই রকম বস্তাপচা ধারণায় নিজেদের সঁপে দিয়েছেন এমনকি যাঁদের চুল ছিল ছোট, সেইসব মহিলারাও? কারণ যাই হোক, যেসব মহিলাদের চুল ছিল ঘাড় পর্যন্ত, তাঁদের অনেকেরই চুল নিশ্চিতই কোমর ছাপিয়ে যাবে, সব স্বাভাবিক হতে হতে।  
স্ত্রীরা স্বামীদের চুল কেটে দিচ্ছিলেন­–এই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু মানুষ নিজের চুল নিজে কাটবে? না, এ কথা কেউ লকডাউনে বাড়িতে চুল কাটা শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও ভাবেনি।  কিন্তু ভাবল। জানা গেল অনেক অজানা তথ্যও। বিখ্যাত সাহিত্যিক তপন বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন যে, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নিজের চুল নিজেই কাটেন। সেলুনে অনেকের ব্যবহার করা কাপড়চোপড় বা কাঁচি ব্যবহারে অনেকেরই মতো তাঁর প্রবৃত্তি হয় না। কিন্তু, নিজের চুল নিজে কাটতে গিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা পোহাতে হয় পেছনের চুল কাটা নিয়ে। কেননা, আয়নায় নিজের চুলের পেছনের দিক দেখা যায় না। অভয় দিলেন তপনদা। যে, চেষ্টা করলে পেছনের চুলও কাটা যাবে। আমারই চেনা জানা কেউ কেউ এই অভয়বাণী শুনে নিজেরাই কেটে ফেললেন চুল। এবং সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেললেন যে, না, লকডাউন উঠে গেলেও আর সেলুনে যাবেন না। কেউ কেউ অবশ্য বাড়িতে চুল কাটার পথেই গেলেন না। আমি নিশ্চিত, আগামী কিছুদিনও এঁরা চুল কাটবেন না। এবং কিছুদিনের মধ্যেই অনেক পুরুষেরই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট হতে যাচ্ছে পনিটেল।
মজা করে লিখলাম বটে উপরের কথা ক’টি, কিন্তু এই মজার ঠিক নীচ দিয়েই বয়ে চলেছেন বেদনার ফল্গুধারা। যতই আমরা বাড়িতে নানাভাবে চুল কাটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি বা পণ করেছি যে, চুল কাটব না কিছুতেই, ততই অশনিসঙ্কেত দেখেছেন সেলুনের মালিক আর কর্মীরা। এখন সংক্রমণের ভয়ে কেউ যদি না-যেতে চান সেলুনে, তাহলে তাঁকে তো আর দোষ দেওয়া যায় না। একই অবস্থা নিশ্চয়ই শুধু মেয়েদের বা ইউনিসেক্স বিউটিপার্লারগুলিরও। কেননা সকলেই ভাবছেন যে, সেলুন বা পার্লারে গেলে যে-জিনিসটিকে আজ সবচেয়ে বেশি ভয়, সেই স্পর্শ থেকে বাঁচবেন বা কী করে? তবে নামীদামি চেনের পার্লারগুলি হয়তো বা সঠিক পদ্ধতিতে স্যানিটাইজ করে, সামাজিক দূরত্বের নিয়মবিধি মেনে তাও কিছুটা খদ্দের ফেরত পাবে। সাধারণ সেলুনগুলির পক্ষে নানা ধরনের নিয়মবিধি মানা বেশ মুশকিলের!
তবে মুশকিলেরই বা বলি কী করে? আনন্দবাজার পত্রিকাতেই একটি খবর প্রকাশ পেয়েছে বিশ্বজিৎ প্রামাণিককে নিয়ে। তাঁর একটি সেলুন আছে কৃষ্ণগঞ্জে। সেলুনটি ‘বিশুর সেলুন’ নামেই পরিচিত। সেই সেলুনে বিশ্বজিৎ নিজে যে প্রায় শল্য চিকিৎসকের বেশে খদ্দেরদের চুল দাড়ি কাটছেন তাই নয়, চুল কাটার সমস্ত যন্ত্রপাতি ভালো করে স্যানিটাইজ করছেন। কুড়িখানা গা-ঢাকা বানিয়েছেন নতুন। একটা ব্যবহার করা হয়ে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিচ্ছেন ডিটারজেন্টে। খদ্দেরদের রীতিমতো ‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট’ নিয়ে আসতে হচ্ছে সেলুনে। কেননা, সেলুনে অপেক্ষা করা যাবে না। ঢোকার আগে একটি ডায়েরিতে খদ্দেরকে নিজের নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর লিখে দিতে হচ্ছে। সন্দেহ নেই, খুবই জরুরি এই কাজটি। চুল কাটার জন্য দাম অবশ্য বিশু খুব একটা বাড়াননি। বাড়িয়েছেন মাত্র পাঁচ টাকা। এত কিছুর ফলেই, খবরে জানানো হয়েছে যে, এলাকার মানুষ ‘বিশুর সেলুন’-এ চুল কাটতে তেমন ভয় পাচ্ছেন না।
সর্বত্র কিন্তু একই চিত্র নয়। বর্ধমানে আমি চুল কাটি কার্তিকদার সেলুনে। এর একটা পোশাকি নাম আছে। ‘পার্ক অ্যাভিনিউ’, সেলুনটি বুড়ির বাগানের গায়ে। ফোন করেছিলাম তাঁকে। সেলুন খুলেছে। স্বাস্থ্যবিধি মানাও হচ্ছে। কিন্তু তাও কার্তিকদা বিষণ্ণ। খদ্দের কমে গেছে পঁচাত্তর শতাংশ! শুনে ভাবছিলাম যে, শহরে বা গঞ্জে এত নিয়ম কানুন মেনে সেলুন চালানো সম্ভব, চেষ্টা করলে। কিন্তু কী হবে গ্রামের ইটালিয়ান সেলুনগুলির? আমি নিজেই ইটালিয়ান সেলুনে চুল কেটেছি বহুবার। এখনও গ্রামে হাটের মধ্যে কাঠের বাক্স নিয়ে বসে থাকেন নাপিত। ইটের চেয়ারের ওপর ছাতা রেখে দিব্যি চলে সেলুন। কলকাতা শহরেও কোথাও কোথাও যে এইরকম দৃশ্য দেখিনি, তা নয়। কী হবে এই সব শস্তার সেলুনগুলির? গরীব মানুষই যেগুলির মূল খরিদ্দার?
হতাশার কথার মাঝেই একটি খবরে চোখ রেখে মন একটু ভালো হল।  সেই খবরটিও প্রকাশ পেয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকাতেই। মুম্বাইতে সেলুন চালান রবীন্দ্র বিরারি। তিনি প্রতি সোমবার নিজের সেলুন বন্ধ রেখে পৌঁছে যাচ্ছেন মুম্বাইয়ের কোন একটি এলাকায় আর বিনে পয়সায় কেটে দিচ্ছেন চুল, মূলত গরীব মানুষদের। এটি অবশ্য তাঁর পুরোনো অভ্যেস। এই দুঃসময়েও সেই পুরোনো অভ্যেস ছাড়তে পারেননি রবীন্দ্র! এই রকম একটি খবর পড়লে হাজারো দুশ্চিন্তার মাঝেও মন ভালো হয়ে যায়।
আসলে, প্রতি পেশাতেই এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁরা গভীর অন্ধকারে জোনাকির মতো নিভে গিয়েও ঠিক জ্বলে ওঠেন।
                                                                                                            অংশুমান কর
স্কেচঃ দেবাশিস সাহা

Thursday, June 11, 2020

গৃহশিক্ষকেরাও পড়েছেন করোনার কবলে

বইয়ের পাতায় পড়েছিলাম এতদিন কী ভয়ংকর হতে পারে মহামারী। কিন্তু সেই ভয়ংকর অসুন্দরকে আমরা দেখতাম ইতিহাসের দূর থেকে। গল্পগাছায় উল্লেখ করতাম তার। মহামারীর সময়ে বিভিন্ন মনীষীর ভূমিকা, নির্মিত  শিল্পকর্মের তারিফ করতাম। কখনও ভাবিনি যে, এইসব অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আমাদের নিজেদেরই যেতে হবে। কিন্তু যেতে হচ্ছে। এবং যেতে হচ্ছে মহামারীর মধ্যে দিয়ে নয়, অতিমারীর মধ্যে দিয়ে। ক্রমশ প্রকাশ্য হচ্ছে কত বিচিত্র অস্ত্রে সজ্জিত কোভিড ১৯আঘাত হানছে কতই না পথ দিয়ে!

            একজন কবি আমার বন্ধু। একদিন হঠাৎ ফেসবুকে তাঁর পোস্ট। যার নির্যাস, লেখালেখি আর করতে পারবেন কি না জানেন না, দিন চলছে না। দেখে, যোগাযোগ করলাম তাঁর সঙ্গে। এতদিন এত কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে এত জায়গায়, কিন্তু কোনওদিন জিগ্যেস করিনি তাঁর পেশা কী। সেদিন জানলাম যে, তাঁর পেশা গৃহশিক্ষকতা। কোনও রোজগার নেই প্রায় শেষ দু’মাসশুনে কী বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। কিছুদিনে পরে এই রকম আর এক ছাত্রের মেসেজ। সে বেচারি এম এ পাশ করেও চাকরি পায়নি। গৃহশিক্ষকতাই তাকে টিঁকিয়ে রেখেছে। তারও কাতর আবেদন, “স্যার আমাদের নিয়ে কিছু লিখুন। ভয় কাটিয়ে যেন অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের পাঠান ব্যাচে–বলুন”ধীরে ধীরে আরও বেশ কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম যে, এটা শুধু এইরকম দু’একজনের নয়, অনেকেরই সমস্যা। বিশেষ করে তাঁদের যাঁরা নিচু ক্লাসের ছেলেমেয়েদের পড়ান। এবং পড়ান বাড়ি বাড়ি ঘুরে নয়, বাড়িতে বসে। মানে এখন যাকে বলে ‘ব্যাচ’–সেই ‘ব্যাচ’ পড়ান।

            উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের, বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যাঁরা পড়ান, যা খবর পেয়েছি, তাঁরা অতখানি সঙ্কটে নেই। তাঁরা দিব্যি চালিয়ে নিচ্ছেন ওই অনলাইন ক্লাস-এর মাধ্যমেই। সমস্যায় পড়েছেন তাঁরাই যাঁরা নিচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের পড়ান। এঁদের মধ্যেও যাঁরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়ান, তাঁরা কেউ কেউ, যাঁরা সাহসী, কিছুদিন অপেক্ষার পরে শেষমেশ যেতে শুরু করেছেন কিছু বাড়িতে। যাচ্ছেন সেই সব বাড়িতেই যেসব বাড়ির অভিভাবকেরাও একটু বেশি সাহসী। কিন্তু যাঁরা নিজেদের বাড়িতে ওই ‘ব্যাচ’ পড়াতেন এতদিন, তাঁদের অবস্থা বেশ করুণ। এঁদের সমস্যা কোথাও অনেকখানি গভীর এই কারণেই যে, এঁদের অনেকেই সরকারি বা বেসরকারি চাকরি না-পেয়ে ওই গৃহশিক্ষকতার ভরসাতেই সংসারও শুরু করেছেন। বিয়ে করেছেন। সন্তান হয়েছে। আজ পড়েছেন গভীর সংকটে। এঁদের সংকট কোথাও একটা, এক হিসেবে, বিপন্ন অন্য অংশের মানুষদের চেয়েও হয়তো গভীর কারণ এঁরা গিয়ে ফ্রি ‘রেশন’ বা ‘কমিউনিটি কিচেন’-এর লাইনে দাঁড়াতে পারছেন না। গ্রামে বা এলাকায় এঁরা অনেকেই এতদিন অন্য সম্মান পেয়েছেন। যতই ‘গৃহ’ শব্দটি আগে থাকুক, এঁরা তো শিক্ষক। তাই আজ হঠাৎ করে এমন কোনও কাজ করতে পারছেন না যা শিক্ষকদের অন্তিম সম্বল ‘সম্মান’টুকুকে বিসর্জন দেবে। 

            আসলে গৃহশিক্ষকদের আমাদের সমাজ তেমন সম্মান দেয়নি কোনওদিন। মনে পড়ছে এই বিষয়টি নিয়ে বন্ধু লেখক উল্লাস মল্লিকের একটি অসামান্য রম্যরচনা পড়েছিলাম কয়েকবছর আগে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে টিউশন পড়ান যাঁরা তাঁদের কত বিচিত্র সব অভিজ্ঞতারই না সাক্ষী হতে হয়–সেসবই লেখা ছিল তাতে। গৃহশিক্ষকের একটু আদর আপ্যায়ন জুটলে তাকে সন্দেহ করতে হবে–এই রকম বার্তা নিয়ে এই বিষয়ে ওই দুধ বা পায়েসের চুটকিও সমাজে চালু আছে। প্রশ্ন তোলা যেতে পারে যে, গৃহশিক্ষকতা কি আদৌ সমর্থনযোগ্য? ক্লাসের পড়া যদি ক্লাসেই হয়ে যায়, তাহলে গৃহশিক্ষকদের আদৌ প্রয়োজনই বা কেন? সঙ্গত প্রশ্ন। কিন্তু, এর উত্তরে বলা যায় যে, এই পেশাটি হঠাৎ করে আমাদের দেশে আবিভূর্ত হয়নি। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এই পেশাটির জন্মলাভের পেছনে নানা আর্থ-সামজিক কারণ আছে। গৃহশিক্ষকতার এক দীর্ঘ ঐতিহ্যও এই বঙ্গে আছে। রবীন্দ্রনাথ কি রবীন্দ্রনাথ হতেন তাঁর গৃহশিক্ষকদের ছাড়া? একটি কথা অবশ্য এখানে  স্পষ্ট করে বলে নেওয়া ভালো যে, এখন বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এইরকম নানা স্তরের শিক্ষায়তনের মাস্টারমশাই/দিদিমণিদের মাইনেপত্র (নানা বঞ্চনা সত্ত্বেও) যথেষ্ট সম্মানজনক, তাঁদের গৃহশিক্ষকতা করা শোভা পায় না। এক সময় কিন্তু সংসার প্রতিপালনের জন্য বিভিন্ন সরকারি স্কুল-কলেজের মাস্টারমশাইদেরও গৃহশিক্ষতা করতে হত। সে-প্রয়োজন আজ আর নিশ্চিতভাবেই নেই। প্রত্যন্ত গ্রামে-গঞ্জে স্কুল কলেজ তৈরি হয়ে যাওয়ার পরে সবচেয়ে ভালো হত এই পেশাটি না-থাকলেই। কেউ যদি গৃহশিক্ষতাকে ‘ব্যবসায়’ পরিণত করেন তাহলে সেই কাজটিকেও সমর্থনযোগ্য মনে করি না। একবারেই সমর্থন করি না ক্লাসের সময়ে ক্লাসে না এসে, ছাত্রছাত্রীদের ‘ব্যাচে’ যাওয়াওকিন্তু আমাদের দেশে স্কুল-কলেজগুলিতে শিক্ষক সংখ্যার অনুপাতে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যার যা-হার তাতে সকলের পড়া ক্লাসেই হয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব। তাই এই পেশাটিকে হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও নির্মূল করা যায়নি। এর সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হয়েছে ছাত্রছাত্রী আর অভিভাবকদের ‘টিউশন’ পড়তেই হবে এই হিড়িকও।  আদর্শ একটি শিক্ষাব্যবস্থা কি স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও আমাদের দেশে আমরা তৈরি করতে পেরেছি? নানা ধরনের ব্যাধিকে সঙ্গী করেই তাই গৃহশিক্ষকতার পেশাটি রয়েই গেছেগোটা ভারতবর্ষ জুড়েই বিরাজ করছেএও বলব, আমি দেখেছি যে, আমার অনেক দুঃস্থ ছাত্রছাত্রী এমনকি পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্যই একাধিক টিউশন করছে। তাঁদের আমি দোষ দিতে পারি না। একইভাবে দোষ দিতে পারি না সেই সমস্ত যুবককেও যাঁরা চাকরি না-পেয়ে এই পেশাটিকে অবলম্বন করে জীবনে একটু শক্ত মাটিতে দাঁড়াবার চেষ্টা করছেন। সকলে তো আর একই উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনে গৃহশিক্ষকতা করেন না।

            পেশাটি ‘নৈতিক’ কি না, সে তর্ক পরে করা যাবে। এই লেখাটিতে আমি সে তর্ক তুলতেই চাইছি না। যেহেতু পেশটিকে নির্মূল করা যায়নি, তাই এখন কথা বলতে হবে বাস্তবের জমিতে দাঁড়িয়ে। আর এখন পরিস্থিতি এমনই যে, বিশেষ করে নিচু ক্লাসের ‘ব্যাচ’ পড়িয়ে সংসার প্রতিপালন করতেন যাঁরা, বা যাঁরা টিউশন সম্বল করেই জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনগুলি কোনওরকমে মেটাতেন, তাঁরা সত্যিই বিপদে পড়েছেন। বিপন্ন বোধ করছেন। আমার জানা নেই, কীভাবে তাঁদের এই বিপন্নতা থেকে উদ্ধার করা যাবে। আমার সেই ছাত্রের অনুরোধে সাড়া দিয়ে আমি তো আর অভিভাবকদের বলতে পারি না, সন্তানদের ‘ব্যাচে’ পাঠান। তা হবে হারাকিরি এক আহ্বান।  এঁরা কি তবে অন্য অনেক পেশার মানুষ যেমন আলু-পটল বিক্রি করতে ঠেলা সাজিয়েছেন, সেইভাবেই ঠেলা সাজাবেন সবজিতে? জানি না। সত্যিই জানি না!

            শুধু এইটুকু জানি যে, এঁদের বিপন্নতা সহজে কাটবে না আর সেই বিপন্নতার সামনে বিমূঢ় হয়ে থাকব আমরা।

            আরও বেশ কয়েকটা দিন।

      অংশুমান কর

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা


রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর

বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্ত...