Tuesday, June 2, 2020

Black Lives Matter: সত্যি?

একজন মানুষ অসহায়ের মতো আতর্নাদ করছেন।  বলছেন যে, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না।। অথচ, হেলদোল নেই তাঁর ঘাড়ের ওপর হাঁটু চেপে বীরবিক্রমে বসে রয়েছেন যে সাদা চামড়ার পুলিশ অফিসার, তাঁর। মানুষটি বারবার বলছেন, বলেই চলেছেন  যে, তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। কিন্তু না, তাতেও কণামাত্র নরম হচ্ছে না পুলিশ অফিসারের মন। এতই ঘৃণা তাঁর। এতই ঘৃণা কালো চামড়ার প্রতি! যে-মানুষটিকে তিনি হাঁটুর নীচে চেপে রেখেছেন তাঁর গায়ের রঙ যে কালো! ঘটনাটি যখন ঘটছে, তখন চারপাশে জড়ো হয়ে গিয়েছেন যে-সমস্ত মানুষ তাঁরাও বারবার অনুরোধ করছেন ওই পুলিশ অফিসারকে, তাঁর সঙ্গী বাকি পুলিশ অফিসারদের, ওই কালো মানুষটিকে ছেড়ে দিতে, তাঁর পালস চেক করতে। কিন্তু না। এইসব অনুরোধেও কোনও কাজ হয়নি। ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়েন ওই কালো মানুষটি, বন্ধ হয়ে যায় তাঁর শ্বাস। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি যে, তখনও, হ্যাঁ, তখনও, তাঁর ঘাড়ের ওপর থেকে হাঁটু তুলে নেননি সাদা চামড়ার অফিসার! এই রকম একটি ভিডিও দেখার পরে, তার বিচার-বিশ্লেষণ করতে ইচ্ছে করে না। একটাই শব্দ বুলেটের মতো ছিটকে বেরোতে চায় ওষ্ঠ থেকেঃ ছি!

            কী অপরাধ ছিল ওই কালো মানুষটির, মানে জর্জ ফ্লয়েডের? তিনি ঠকবাজ! ঠকিয়েছিলেন সিগারেট কিনতে গিয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হয় ৯১১-এ। অতি সক্রিয় আমেরিকান পুলিশ মাত্র সতেরো মিনিটের মধ্যে পাকড়াও করে জর্জ ফ্লয়েডকে। তারপরের দৃশ্য আমরা সকলেই দেখেছি। সিগারেট কিনতে গিয়ে বিক্রেতাকে ঠকানোর জন্য একটি প্রাণ নিয়ে নিতে পারে পুলিশ? পারে না, পারে না, পারে না। কোনও দেশেই পারে না। কিন্তু পারল। কেন? কারণ, ঘৃণা। কারণ রেসিজম। কালো মানুষদের এখনও সহনাগরিক ভাবতে না-পারার অসুখ!

            এই ঘটনাটির পরে উত্তাল হয়েছে আমেরিকা। গতি পেয়েছে Black Lives Matter’ আন্দোলনটি। এখনও সে-দেশ উত্তাল। একে কোভিড ১৯-এর থাবা আর তার ওপরে প্রতিবাদ, রায়ট, লুঠতরাজ। ভয়ংকর অবস্থা মার্কিন দেশের। চেনাজানা যেসব ভারতীয় বা বাঙালি বন্ধুরা আছেন ও-দেশে, দুশ্চিন্তা হচ্ছে তাঁদের জন্য। বিভিন্ন হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে তাঁদের অনেকেই ফ্লয়েডের এই নির্মম হত্যার সমালোচনা করছেন, কিন্তু সমর্থন করছেন না লুঠতরাজ আর ভাঙচুরকে। পুলিশও যে অনেক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে সে-দেশে, ঘুষ নেয় না, বলছেন এইসব কথা। আমি নিজে মাত্র একবারই গিয়েছি মার্কিন মুলুকে। সত্যিই স্বীকার করতে হয় যে, পেয়েছি পুলিশের সাহায্য। কিন্তু এশিয়ানদের প্রতি সাদা চামড়ার আমেরিকানদের একাংশের যে-দৃষ্টিভঙ্গি, সেটিই যে হবে কালো চামড়ার মানুষদের প্রতিও তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি–এর কি কোনও নিশ্চয়তা আছে? একজন পুলিশ অফিসারকে দিয়ে যেমন সমস্ত পুলিশ অফিসারকে বিচার করা ঠিক নয়, তেমনই একজন কালো মানুষ যদি কোনও অপরাধ করে থাকেন, তাহলে তাঁকে দিয়ে সমস্ত কালো মানুষদের বিচার করাও কি ঠিক? অথচ আমি নিজে দেখেছি যে, কালো মানুষদের সম্পর্কে সাধারণ একটা ধারণা মার্কিন মুলুকে বাঙালিদের মধ্যেও আছে যে, ওঁরা বিপজ্জনক! একই সঙ্গে একথাও ঠিক যে, সমস্ত সাদা চামড়ার মানুষেরাই বর্ণবিদ্বেষী নন। তবে যে-আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ভাবেই হওয়া উচিত ছিল, সেই আন্দোলন কেন লুঠতরাজ আর ভাঙচুরের পথ নেবে–সে প্রশ্ন তো উঠবেই। ইতিমধ্যেই এই আন্দোলনের নেতারা কিন্তু কড়া সমালোচনা করেছেন এই ভাঙচুরের। দূর থেকে দেখে আমার মনে হচ্ছে, কোথাও একটা যেন চাপা-থাকা, বোতলবন্দি থাকা আক্রোশের দৈত্য বোতল ভেঙে বেরিয়ে পড়েছে! এমন খবরও তো পাওয়া গেছে যে, কোভিড ১৯ আক্রান্ত কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের চিকিৎসা নাকি ততখানি যত্নে হয়নি ও দেশে! আর কে না জানে যে, ফুল জমতে জমতে পাথর হয় আর ক্ষোভ জমতে জমতে আগ্নেয়গিরি। তাও, এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবেই হওয়া উচিত।

            শেষে, একটি কথাআমাদের দেশের অনেকেই, বাঙালিরাও, এই আন্দোলনের সমর্থনে পোস্ট করছেন, লিখছেন। ঠিকই করছেন। কিন্তু, যদি আমরা মনে করি, বর্ণবিদ্বেষ আছে শুধু আমেরিকাতেই, ভুল ভাবব। ‘ব্ল্যাক লাইভস’ কি এ দেশেও ম্যাটার করে? এখনও খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে ফর্সা, সুন্দরী পাত্রীই তো চাওয়া হয়! চান তাঁদের অনেকেই যাঁরা রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’ শুনতে শুনতে মাথা দোলাতে দোলাতে তারিফ করেন ইমেজারি, সুরের চলন আর সুচিত্রা মিত্র বা জর্জ বিশ্বাসের গায়কীর! আরও একটি কথা।  ‘ব্ল্যাক’ শব্দটিকে শুধুমাত্র চামড়ার রঙের দ্যোতক হিসেবে দেখলেও চলবে কি? প্রাথমিক ভাবে এটা তাই। কিন্তু এই রঙটি কি, আজ, তলিয়ে ভাবলে, সামগ্রিক ভাবে ‘সংখ্যালঘু’র প্রতীক হয়ে ওঠেনি? হয়ে ওঠেনি মাইনরিটিদের পরিচিতি চিহ্নিত করার দ্যোতক? কী আচরণ আমরা করে থাকি আমাদের দেশে সংখ্যালঘু মানুষদের সঙ্গে? এই সংখ্যালঘু মানুষ কেবল যে ধর্মীয় পরিচিতিতেই সংখ্যালঘু–তা তো নয়। সাম্প্রতিক অতীতে কতজন দলিত আত্মহত্যা করেছেন আমাদের দেশে? কতজন মুসলিম শিকার হয়েছেন ‘মব লিঞ্চিং’-এর? ‘ব্ল্যাক লাইভস’ সত্যিই কি কোনও দেশেই রাষ্ট্রের কাছে সেইভাবে ‘ম্যাটার’ করে? সংখ্যালঘুর জীবন কি সত্যিই ‘ম্যাটার’ করে সংখ্যাগুরুর একটি বড় অংশের কাছে? এই প্রশ্ন তো আজ উঠবেই।

            তা বলে কি আমরা প্রতিবাদ করব না? নিশ্চয়ই করব। আত্মসমালোচনা করতে করতেই, আত্মগ্লানির কথা বলতে বলতেই, নিজেদের দেশেও এই ধরনের ঘটনা ঘটলে আমরা যেন মুখ খুলতে পারি এই সাহস সঞ্চয় করতে করতেই, ফর্সা সুন্দরী পাত্রী চেয়ে আর বিজ্ঞাপন থাকবে না খবরের কাগজে এই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই আমাদের প্রতিবাদ করতেই হবে। সমস্বরে বলতে হবেঃ ছি!

                                                                                                                               অংশুমান কর

স্কেচঃ দেবাশিস সাহা


 

 


32 comments:

  1. খুব সুন্দর দাদা!

    ReplyDelete
  2. It's really horrible ! When in nature Black is beautiful , we the so-called human beings are beyond Nature or God to judge what is black what is white ! Even in 2020. Apart from technological development we are still living in the world of mediaeval world . We need another renaissance of self - realisation- What humans we are !

    ReplyDelete
  3. ঠিকই। কিন্তু সেই উপলব্ধি হলে তো!

    ReplyDelete
  4. আমাদের কাছে ক'টা লাইফ ম‍্যাটার করে? বলতে ইচ্ছে করে, আর কতজন ভারতীয় ফ্লয়েড হলে...!

    ReplyDelete
  5. Khub sundr sir....obbosoi bolbo,protbad janbo.

    ReplyDelete
  6. এই লেখা টা পড়ব বলে বারবার ভাবছিলাম। শেষে পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো এই কথা গুলো আমিও বলতে চাই। সমস্ত রাষ্ট্রের পুলিশ ই কমবেশি বর্বর (কিছু সংখ্যক ভালো)। যেটা আমরা কিছু দিন আগে দিল্লী হিংসার সময়েও দেখেছি , আমার দেশের একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষ দের কে পুলিশ কি মুখে রুল গুজে দিয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ানোর চেষ্টা করছে। সত্যি আমাদের তো আর কিছুই করার নেই এর বিরুদ্ধে এই লেখাগুলো ছাড়া।

    খুব ভালো লিখেছেন অংশুমান দা। ভালো থাকবেন।

    ReplyDelete
  7. জানি না সত্যি সত্যিই কোনোদিনও আমরা আমাদের অন্তরে বহুবছরের সযত্নে লালিত এই বন্ধুবিদ্বেষ থেকে মুক্তি পাবো কিনা। এই যে এই তাৎক্ষণিক গর্জে ওঠা, সামাজিক প্রতিক্রিয়ার প্রবাহে গা ভাসিয়ে নিজেকে বহমান প্রমান করার চেষ্টা তা কি কখনো এই বিষবৃক্ষ কে উপড়ে ফেলতে পারবে? ধর্ম, জাতি বা বর্নের ভিত্তিতে এই যে অসম বিভাজন তা যথার্থ ভাবেই তার চোরাস্রোত বজায় রাখে আমাদের এই মুহূর্তযাপনের বাইরে। একজন শিক্ষক হিসেবে, বাবা হিসেবে বা কখনো বন্ধু হিসেবে শুধু নিরন্তর চেষ্টা করে যাই দ্বেষের গন্দেগি সরিয়ে ভালবাসার বীজ বপনের। সাথে থাকে আপনার মত মাস্টারমশাইয়ের, সংবেদী মানুষের নিয়ত আশ্বাসবাণী। ভালো থাকুন আমার প্রিয় মানুষ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. এই চেষ্টাটুকু আমাদের সকলকে করে যেতে হবে, অভিষেক। এটাই আমাদের কাজ।

      Delete
  8. একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতাও সাদা-কালোর বিচারে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হাঁটুর নীচে কয়েক মিনিটের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে মারা গেল !
    সাদা অর্থে একটা পবিত্র-নির্মল ধারণা ছিল মনে, মানব-সভ্যতার পীঠস্থানে তা আবারও প্রমাণিত হলো কী ভয়ঙ্করতম কালোর গভীরে তার অধিষ্ঠান।
    আপনার সুরে তাই আমিও বলি, "একটাই শব্দ বুলেটের মতো ছিটকে বেরোতে চায় ওষ্ঠ থেকেঃ ছি!"

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেই ধিক্কার তো জানাতেই হবে।

      Delete
  9. পড়ে ভালো লাগলো।

    ReplyDelete
  10. কি জানি স্যার কালো সাদা বুঝতে গিয়ে কখন জীবন সাদাকালো হয়ে গেছে টের পেলামনা , তবে মানসিক কালো রঙের কি কোন প্রতিকার জানা আছে স্যর?

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেটাই তো বলতে চেয়েছি এই লেখায়।

      Delete
  11. অসাধারণ! আমাদেরকেও প্রতিবাদমুখর হতে হবে যখনই এই রকম ঘৃণ্য কাজ ঘটবে আমাদের দেশে। আমাদেরকে সমস্বরে বলতেই হবে ছিঃ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. একদম। ধিক্কার জানাতেই হবে।

      Delete
  12. আমার প্রিয় এক মানুষ রাগ হলে মাঝে মাঝে আমাদের বলতেন "তোমরা কি মানুষ"...চারদিকে যেসব ঘটনা ঘটছে এখন সত‍্যিই মনে হচ্ছে আমরা কি মানুষ । মানুষ ,পশু কেউই তো বাদ যাচ্ছে না নির্মমতার হাত থেকে!!! রাগ হচ্ছে ভীষণ।অথচ নিরূপায় ।

    ReplyDelete
  13. খুবই প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োজনীয় লেখা

    ReplyDelete
  14. এতো এত বিভাজন এড়িয়ে আমরা মানুষ হব কবে?

    ReplyDelete
    Replies
    1. সেই প্রশ্নের উত্তর নেই রে ভাই!

      Delete
  15. ঠিকই বলেছেন দাদা । সব্বাই কে এর প্রতিবাদ করা উচিৎ।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হুম। শব্দের জোর আছে, এটা মানি। দেখা যাক কী হয়।

      Delete
  16. সত্যিই আমরা কত বড়াই করি, সভ্যতা কত এগিয়ে গেছে এই নিয়ে,অথচ মাঝে মাঝে ভুলেই যাই, বর্ণবিদ্বেষ, জাতিভেদ প্রথা এ, রেসিজম সেই থেকেই গেছে কোথাও না কোথাও মনের আনাচে কানাচে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হেঁটেছি অনেক কিন্তু এগোতে পারিনি তেমন।

      Delete

রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর

বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্ত...