Tuesday, June 16, 2020

সুজয়কে ‘হিজড়ে’ বললেন যাঁরা, তাঁরা আসলে করোনার আগেও মাস্ক পরেই ছিলেন


সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জিকে অপমান করা হয়েছে বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবে। অবশ্য এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রোয়িং ক্লাবের ঘটনাটি রত্নাবলী রায় প্রকাশ্যে আনার পরে সুজয় ফেসবুকে আর একটি পোস্ট দেন সেখানেও দেখা যায়, যে শব্দটি বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবে তাঁর উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছিল, সেই একই শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তাঁর একটি কাজের প্রক্ষিতে করা একটি মন্তব্যে। শব্দটি হল, ‘হিজড়ে’। যাঁরা এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন সুজয়ের উদ্দেশ্যে তাঁদের ধিক্কার জানাই।

          লেখা এগোনোর আগে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো। সুজয়ের ‘সাপোর্ট’ প্রয়োজন বলে আমি এই লেখা লিখছি না। রত্নাবলী রায় ঠিকই লিখেছেন যে, সুজয় একাই একশো। এই লেখা এই কারণেও লিখছি না যে, সুজয় আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমার বেশ কিছু কবিতা ও আবৃত্তি করে থাকে। আমরা দুজনে বেশ কয়েকবার মঞ্চে একসঙ্গে উঠেছি, আবারও উঠব। কিন্তু এইসব ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার কারণে এই লেখা লিখছি না। লিখছি রাগ আর বেদনা থেকে। কেউ যদি জিগ্যেস করেন, সুজয়ের বদলে এ ঘটনাটি অন্য কারও সঙ্গে ঘটলে কি লিখতেন কিছু? জানতে পারলে হয়তো লিখতাম, হয়তো লিখতাম না। কিন্তু আমার অবস্থান একই থাকত। এটা তো ঠিকই যে বন্ধুকে অপমান করা হয়েছে শুনলে আমরা একটু দ্রুতই প্রতিক্রিয়া দিয়ে থাকি।

          কী ঘটেছিল সুজয়ের সঙ্গে? তিনি রোজ বিকেলবেলা হাঁটতে বেরোন। সাদার্ন অ্যাভিনিউ থেকে বেরিয়ে তিনি হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলেন বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবের দিকে। সেখানে তাঁর টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ক্লাবের দারোয়ানের অনুমতি নিয়েই মাস্ক-পরা, হাতে স্যানিটাইজার থাকা সুজয় ক্লাবের ভেতরে ঢোকেন। এবং সেখানেই তাঁকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দেওয়া হয়। বলা হয়, যে তিনি বাথরুমে যেতে পারবেন না, কারণ ক্লাবটি ‘হিজড়ে’দের নয়! শেষমেশ সুজয়কে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয় ওই ক্লাবটি থেকে। কলকাতা শহরের এই রকম বেশ কিছু ‘অভিজাত’ ক্লাব মান্ধাতার আমলের ‘ঔপনিবেশিক’ নানা প্রটোকল রক্ষার নামে হামেশাই অপমান করে থাকে সমাজে যাঁরা অন্যভাবে  স্বীকৃত সেই সমস্ত ব্যক্তিদের। কিন্তু এই ঘটনাটি ঠিক সেই জাতের নয়। বাহ, হয়তো সেই জাতেরই যেখানে বুঝিয়ে দিতে চাওয়া হচ্ছে যে, লিঙ্গ পরিচয়ে তুমি ‘স্ট্রেট’ না-হলে এইরকম একটি ক্লাবে তোমার প্রবেশাধিকার নেই।

          সুজয়ের পোস্ট থেকে জানা যায় যে, ‘হিজড়ে’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ওঁদের একটি সাম্প্রতিক কাজের প্রেক্ষিতেও। ‘যুদ্ধজ্বর ও রবীন্দ্রনাথ’ এই বিষয়টি নিয়ে একটি কাজ করেছেন সুজয় ও আরও কয়েকজন। কাজটির ইংরেজি শিরোনাম “The Poet and the Pandemic”। আমি কাজটি দেখেছি। খুবই পছন্দ হয়েছে কাজটি আমার। এই কাজটি সুজয়ের এক বন্ধু হোয়াটস অ্যাপে পাঠান তাঁর এক বন্ধুকে। তিনি উত্তরে লেখেন যে, তিনি এই ‘হিজড়ে’ সুজয়ের কোনও কাজেই আগ্রহী নন। এরপরেও তিনি আরও একটু সংযোজন করেন যে, কাজটির কিছুটা তিনি শুনেছেন এবং কাজটি ‘ক্লিশে’। এরও পরে আরও যোগ করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠিক সবার জন্যে নয়। ভাবা যায়! এই ব্যক্তি, তার মানে, নিজেকে রবীন্দ্রঅনুরাগী ও বোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন এবং সুজয়কে ‘হিজড়ে’ বলতে তাঁর ঠোঁট কাঁপে না। প্রশ্ন জাগে, তিনি কি সত্যিই রবীন্দ্রনাথ হৃদয় দিয়ে পড়েছেন, সেই রবীন্দ্রনাথ যিনি সেই কতকাল আগে লিখেছিলেন ‘চিত্রাঙ্গদা’?

          ঘটনাটি নিয়ে কাল রাতে এক বন্ধুর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনিও বললেন যে, তাঁদের পাড়ায় তৃতীয় লিঙ্গের কিছু যুবক থাকে। তাঁদের নিয়ে মজা করে আনন্দ পান কিছু বয়স্ক মানুষ। আরও বললেন যে, একবার সমকামিতার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে তাঁকেও শুনতে হয়েছিল ‘হিজড়ে’ শব্দটি। এক ‘বন্ধু’ই তাঁকে বলেছিলেন, তিনি যে সমকামিতার পক্ষে এত সওয়াল করছেন, তিনি কি ‘হিজড়ে’ নাকি?

এই যে বারবার হিজড়ে বলা হচ্ছে সুজয়কে, বা অন্য কাউকে কাউকে, এতে কি তাঁদের অপমান হচ্ছে? অপমান হচ্ছে ‘হিজড়ে’দের? তাঁদের যাঁরা লিঙ্গ-পরিচয়ে পুরুষ আর নারী–এই বাইনারির বাইরে থাকেন? না, একেবারেই না। বরং এই কাজ যাঁরা করছেন তাঁরা বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, ‘ভিন্ন’ কোনও কিছুকেই গ্রহণ করতে তাঁরা অপারগ। তাঁরা আসলে ভেতর থেকে অসহিষ্ণু। একজন মানুষ যে ধর্ম পরিচয়ের মতো লিঙ্গ-পরিচয়েও তথাকথিত ‘স্ট্রেট’দের চেয়ে আলাদা হতেই পারেন–এই বোধটিই তাঁদের নেই। শুধু যে-পুরুষদের ‘আচার আচরণ’ ঠিক ‘পুরুষালি’ নয় বরং খানিকটা ‘মেয়েলি’, তাঁদেরই যে এই অপমানের মুখে পড়তে হয় তা নয়; যে-সব নারীরা একটু ‘পুরুষালি’, আক্রমণ আর বিদ্রুপের লক্ষ্য করা হয় তাঁদেরও।

সুজয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাদু’টি থেকে আর একটি জিনিসও পরিষ্কার হচ্ছে। একজন মানুষকে তাঁর একটিমাত্র ‘পরিচিতি’ (সেটিও সমাজ নির্মিত, সেই ব্যক্তি নিজেই চাইলেও নিজের পরিচিতি নির্ধারণ করতে পারেন না) ব্যবহার করেই মেপে নিয়ে দাগিয়ে দেওয়া হয় এই সমাজে। আজও। অথচ সেই কতদিন ধরে অর্মত্য সেনের মতো তাত্ত্বিকেরা তো বলেই চলেছেন যে, আমাদের পরিচিতি আসলে একাধিক। আমরা একই সঙ্গে হতে পারি ‘গে’ বা ‘স্ট্রেট’ আবার রবীন্দ্রপ্রেমী বা নজরুল অনুরাগী, ইস্টবেঙ্গল বা মোহনবাগানের সাপোর্টারও। আমরা এই কথা মনে রাখি না, মনে রাখি না। একজন ব্যক্তিকে একটি মাত্র পরিচিতির অন্ধকূপে নির্বাসিত না-করা পর্যন্ত আমাদের শান্তি নেই।

বেঙ্গল রোয়িং ক্লাবের পক্ষ থেকে সুজয়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। ক্ষমা না-চাইলেও এই ঘটনায় সুজয় ভেঙে পড়তেন না, আমি জানি। তবে সুজয় ভেঙে না-পড়লেও এই ধরনের আক্রমণের মুখে পড়লে অন্য কেউ অবসাদের শিকার হতেই পারেন।  ঘটনাটি থেকে এও বোঝা গেছে যে, এমনকি অভিজাত ক্লাবের শিক্ষিত সদস্যরাও হোমোফোবিক। এমনকি রবীন্দ্রপ্রেমী, রবীন্দ্রনাথ যাঁকে উদার করবেন বলেই আমরা আশা করি, তিনিও হোমোফোবিক। বোঝা গেল যে, এঁরা আসলে অনেকের মতো এতদিন মাস্ক পরেই ছিলেন। পৃথিবীতে করোনা আসার বহু আগে থেকেই।     

করোনাকে হয়তো একদিন বশে আনা যাবে। কিন্তু কিছু রোগের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চালাতে হবে আরও অনেকদিন।


অলংকরণঃ দেবাশিস সাহা


37 comments:

  1. একদম ঠিক বলেছেন।

    ReplyDelete
  2. #ওরা_তালি_দিতে_জানেনা

    হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন মাননীয় আমরা দুই লিঙ্গের মধ্যে নেই,
    হ্যাঁ, আপনি ঠিক বলেছেন মাননীয় আমরা যুদ্ধে রাজনীতি খুঁজিনা,
    হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন মাননীয় আমরা তৃতীয় বিশ্বের তৃতীয় লিঙ্গ!
    "হিজড়ে" বলে দিলেই আপনাদের মুখোশ ঠিক থাকবে?
    অথচ তখন মুখোশ পড়া বাধ্যতামুলক ছিল না!
    আপনারা মাননীয় মুখোশের আড়ালে দিব্যি বাঁচেন ...
    অথচ আমরা হাততালি দিলেই এমনি নাচেন!
    চেষ্টা কিছু কম করেনেনি ওই "হিজড়ে" নামকে গালাগাল বানানোর ,
    অথচ আপানদের খোকা খুকু তাকিয়ে থাকে ঠোঁট ছোঁয়ানোর !
    হ্যাঁ মাননীয় যখন আপনারা নিজেদের গলে যাওয়া মুখোশে সাবানজলের গন্ধ পান...
    ঠিক সেই সময়ে আমরা তালি দিয়ে উঠি!
    আপনারা "হিজড়ে" বলে পালিয়ে যান!

    ReplyDelete
    Replies
    1. একটা কবিতা যদি একটা লেখা জন্ম দিতে পারে তো অনেক।

      Delete
  3. পড়লাম .. .. রবীন্দ্রনাথ যাদের showcase এর সম্পদ তাদের রবীন্দ্রনাথ পড়া আর না পড়া সমান... তারা একাজ করতেই পারে .. অবাক হই না আর

    ReplyDelete
    Replies
    1. হুম। ঠিকই বলেছেন।

      Delete
  4. আপনি লিখে ঠিক করেছেন।আমি সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জীকে চিনি না।তবুও বলছি যারা সুজয়কে একটা জায়গায় থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে তারা হয়ত সুজয়কে কর্নার করতে পারেন,তাঁর কাজকে নয়।তুর্কি লেখক আহমেত আলটন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,তোমরা আমাকে আটকে দিতে পারো,আমার কলমকে নয়,আমার শব্দকে নয়,সে ক্ষমতা তোমাদের নেই...স্যালুট সুজয়

    ReplyDelete
  5. যথার্থ লেখা ۔ভালো থাকো۔۔ এভাবেও যদি কিছু মানুষের চেতনা হয় ۔

    ReplyDelete
  6. মানুষ কথাটার ব্যপ্তি যারা বোঝে না,তারাই অন্য মানুষকে অসম্মান করে। তা না হলে ধর্ম নিয়ে,নারী,পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ নিয়ে এত সমস্যার সৃষ্টি হত না।

    ReplyDelete
  7. এই বিষয়ে লিখে খুব ভালো করেছেন। মানুষের মধ্যে যে কতটা মূর্খামী আছে তা এইসব ঘটনায় প্রকাশ পায়। মানুষ নিজে যা তার বাইরে কিছু ভাবতে পারেনা

    ReplyDelete
    Replies
    1. একদিক দিয়ে ঠিকই। যে যেরকম, সে সে রকম ভাবেই ভাবে।

      Delete
  8. 'সত্য সেলুকাস ! কী বিচিত্র এই দেশ !'
    মানুষের শরীর লাভ করলেও, মানুষের মন আমরা অর্জন করতে পারলাম না ! অহংকারের অন্ধকারে দু'চোখ ঢেকে কূপমণ্ডূক হয়েই রইলাম !
    অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক লেখা।

    ReplyDelete
  9. Manasikatar pribartan bhison proyojon
    Manush literate hochche educated hochche na
    Educated na hole ei manasikatar poribartan bhison kothin

    ReplyDelete
  10. শিরোনাম দেখে ভয় পেয়েছিলাম।সেটা অন্য কারণ। পড়া শেষ করে আবার ভয় পেলাম, সেটা আরও অন্য কারণ।

    ReplyDelete
  11. খুব ভালো লেখা ৷তোমার কলম তো এরকমই ধারালো যুক্তিপূর্ণ ৷ ধন্যবাদ ভাই

    ReplyDelete
  12. Replies
    1. ধন্যবাদ ঈশিতাদি।

      Delete
  13. খুব খারাপ লেগেছে সুজয় প্রসাদ এর মত একজন মানুষকে এভাবে মন্তব্য করার জন্য... আরো কত মানুষ আছে স্টেট না হওয়ার কারণে এরকম মন্তব্যের শিকার হয়েও অবসাদগ্রস্ত করছেন সে হিসেবে করা মুশকিল... মনোভাব না বদলালে আরও অনেক মানুষ অবসাদগ্রস্ত হবে.. খুব ভালো লিখেছেন, এই ধরনের লেখা পড়ি যদি মনোভাব একটু বদলায়.তাতেই ভালো..

    ReplyDelete
  14. খুব খারাপ লাগলো সুজয় পোশাকের মতো এরকম একজন মানুষকে এভাবে মন্তব্য করায়.. স্ট্রেট না হওয়া মানুষগুলোকে যে কত এরকম মন্তব্য শুনতে হয় তার হিসেব করা কঠিন। তবে এই ধরনের লেখা পড়ে যদি আমি তোকে কিছু মানুষের মনোভাব এর বদল হয় তাকেও লাভ

    ReplyDelete
  15. রবীন্দ্রনাথ বলেনি, দাদা, রবি....

    ReplyDelete
  16. খুব সময়োপযোগী লেখা অংশুমান। এই প্রতিবাদের প্রয়োজন আছে।

    ReplyDelete
  17. 377 কলমে উঠে গেলেও মনে থেকেই গেছে ব্যাক্তিবিশেষে যেমন ঘরের কোনে ঝুলে জমে থাকে।

    ReplyDelete

রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর

বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্ত...