Wednesday, June 24, 2020

লকডাউনে লেখা কবিতা-১


ধার-বাকির জীবন

ধারের ওপরেই চলছে জীবন।

বাঙ্কের কাছে হাত পাতি

ব্যাঙ্ক ধার দেয়।

জীবন বিমা নিগমের কাছে হাত পাতি

মেলে কিছু।

বন্ধু-বান্ধবদের বলি, দাও ভাই

দু-তিন মাসের মধ্যে শোধ করে দেব,

ফেরায় না কেউ।

ধার-বাকিরই জীবন।

চলে যায় এভাবেই।

এমনকি

গাছ, জল, মাটিও

শোধ দিতে পারব না জেনেই

একদিন ধার দেয় শক্তি,

একদিন সৌন্দর্য।

শুধু এই অসময়ে

লজ্জায় 

কারও কাছে কিছুতেই চাইতে পারছি না

তরতাজা একটি মন।

 

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


Monday, June 22, 2020

একজন গুলবাজ মানুষের গল্প






গুল মানে ঢপ দেন যেসব মানুষেরা তাঁদের নিয়ে নানা রকমের গল্প চালু আছে। বাংলা সাহিত্যের চরিত্রগুলির মধ্যেও আছে এই রকম গুল দিতে পারা নানা বিখ্যাত পুরুষ ও মহিলা। এঁদের মধ্যে কেন জানি না সেই কোন ছেলেবেলায় পড়া “তাসের ঘর” গল্পের শৈলর জন্য আজও মাঝে মাঝে আমার মন কেমন করে। সে এক অন্য প্রসঙ্গ। আজ বলব এমন একজন মানুষের কথা যাকে আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। যে ছিল আমাদের একান্নবর্তী পরিবারেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

        এই মানুষটির সম্বন্ধে ইচ্ছে করেই ‘যাঁকে’ শব্দটি ব্যবহার করলাম নাচন্দ্রবিন্দু শুধু তো  সম্ভ্রমের নয়, কখনও কখনও  দূরত্বেরও প্রতীক। সাধনদার সঙ্গে আমার সেই দূরত্ব ছিলই না যাতে ওকে আমি আপনি আজ্ঞে করতে পারি। আমি ওকে বলতাম ‘তুমি’; ও আমাকে বলত, ‘তুই’এই মানুষটি আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। বছর দুয়েক আগে হঠাৎই মারা যায় সাধনদা। নিজের গ্রাম থেকে দূরে থাকার কারণে ওর মৃত্যুর খবরই পেয়েছিলাম সাধনদা চলে যাওয়ার পরে। একটি কবিতা লিখেছিলাম ওকে নিয়ে।। সেটি প্রকাশ পেয়েছিল সে-বছরের শারদীয়া ‘দেশ’ পত্রিকায়। অনেকে হয়তো পড়ে থাকবেন সে-লেখা। নাম ছিল ‘একটি পাড়াগাঁর রূপকথা’

        কবে যে সাধনদা এসেছিল আমাদের বাড়িতে, কী উপলক্ষ্যে, তা আজ আর মনে পড়ে না। তবে কোনও উৎসব অনুষ্ঠান হলেই ও হাজির হয়ে যেত। থাকত আমাদের গ্রাম বেলিয়াতোড় থেকে অল্প কিছু দূরের একটা ছোট্ট গ্রামে। বিয়েবাড়ি মানে সাধনদা, অন্নপ্রাশন মানে সাধনদা, শ্রাদ্ধানুষ্ঠান মানে সাধনদা। আর দুর্গাপুজোর সময়ে ওর অনুপস্থিতির কথা আমরা তো ভাবতেই পারতাম না। আমার মনে হয় যেন, আমি সেই ছোটবেলাতেও ওকে যেমন দেখতাম, মারা যাওয়ার আগেও ওকে তেমনই দেখেছি। শিরা ওঠা হাত; সামনের কয়েকটা দাঁত নেই। চুল কালো-সাদা শেষের দিকে অবশ্য সবই পেকে গিয়েছিল। বয়স জিগ্যেস করলে বলত তিন কুড়ির চেয়ে কিছু কম। সেটিও বলত প্রায় বছর কুড়ি ধরে।

        নিজের বয়স নিয়ে এই রকম মিথ্যে তো অনেকেই বলে থাকেন। এ আর তেমন আশ্চর্য কী! কিন্তু শুধু এই ধরনের মিথ্যেই ও বলত না। কবিতাটিতে আমি লিখেছিলাম যে, ওর ভিয়েতনাম যাওয়া নিয়ে ও এক মিথ্যে গল্প ফাঁদত। সত্যিই তাই। মাঝে বেশ কয়েকবছর সাধনদার কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। একেবারে কর্পূরের মতোই উবে গিয়েছিল ও। বা যেভাবে দিনের আলো ফুটলে নিঃশব্দে মিলিয়ে যায় ভোরের শিশির, মিলিয়ে গিয়েছিল সেইভাবেই। তারপরে একদিন আবার হঠাৎ ভোরের বেলাই ও ফিরে এল। তবে শিশিরে শিশিরে চরণচিহ্ন এঁকে নয়, বেশ হাঁকডাক করে। এবং এসেই ঘোষণা করল যে, ওর যে কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তার কারণ ওকে কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভিয়েতনাম!

        কিডন্যাপ? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এই গল্প ও যখন প্রথম বলে তখন আমি নেহাতই কিশোর। তারপরেও অনেক অনেক বার এই গল্প বলেছে ও। আমরাও শুনতে চাইতাম বারবার। বলতাম, বলো না, তোমার ওই ভিয়েতনাম যাওয়ার গল্পটা বলো না। সন্ধে নেমে আসার পরে যখন প্রায় প্রতিদিনই ‘কারেন্ট’ কেটে যেত, আর অন্ধকার নামে এক সর্বগ্রাসী দানোর আক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য ঘরে জ্বলে উঠত লব-কুশের মতো অমিত সাহসী দুই ছোট্ট হ্যারিকেন, দেওয়ালের গায়ে নড়ত চড়ত আমাদের নিজেদের থেকেও লম্বা ছায়া, তখন সাধনদা বলত কীভাবে একজন মানুষ ওকে চাকরির লোভ দেখিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে নিয়ে চলে গিয়েছিল ভিয়েতনাম। আমাদের ছায়ার দোলাচলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দুলত ওর কন্ঠস্বর–চড়ায় উঠত, খাদে নামত।

ভিয়েতনামে ওর চাকরি জুটেছিল এক ব্রথেলে। রোজগার হত ডলারে। আমি জিগ্যেস করতাম, ভিয়েতনাম দেশটা কোথায় তুমি জানো? বলত, খুব ধুরে (দূরে) লয়। তারপর বর্ণনা দিত ব্রথেলের। তার খরিদ্দারদের। কত বিচিত্র তাদের পেশা আর ধরন–বলত সেইসব কথা। ওর কথা শুনে আমাদের মনে হত আমরা যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সব! জিগ্যেস করতাম, ভিয়েতনাম থেকে তুমি ফিরলে কী করে? বলত এক বাঙালি পুলিশ অফিসারের কথা! তিনি নাকি কাজ করতেন ভিয়তনামের পুলিশ ফোর্সে! খরিদ্দার ছিলেন ওই ব্রথেলের। তিনিই ওকে উদ্ধার করে প্লেনের টিকিট কেটে পাঠিয়ে দেন বাড়ি। আমি জিগ্যেস করতাম, বলো তো প্লেনের ভেতরটা কেমন? তখন আর বলতে পারত না। রেগে যেত। বুঝিয়ে দিত যে, ওকে বিশ্বাস করাই আমাদের কর্তব্য। ও ‘গুল’ দিচ্ছে না। বলত যে,  আমাদের যখন এত অবিশ্বাস তখন ও আর কোনওদিন বলবে না ওর ভিয়েতনাম যাওয়ার গল্প। কিন্তু বলত, একটু উসকে দিলেই ও বলত সেই গল্প। যার আদলটা মোটামুটি একই থাকত আর পালটে পালটে যেত খুঁটিনাটি বর্ণনা।

        এখন ভাবি যে, কেন সাধনদা ওই রকম একটা ব্রথেলের গল্প বলত? এ কি ছিল ওর কোনও যৌন অবদমনের প্রকাশ? ভাবি যে, ও কি সত্যিই গিয়েছিল ভিয়েতনাম? মাঝে মাঝে মনে হয় যে, হতেও পারে। ডায়াসপোরা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছি মানুষ পাচার কীভাবে তৈরি করে এক অন্য জাতের ডায়াসপোরা যার গল্প ঝুম্পা লাহিড়িরা লেখেন না! তাহলে কী সত্যিই সাধনদাও ‘পাচার’ হয়ে গিয়েছিল? ভাবলেই মনে হয়, তাই যদি হবে তাহলে ও ফিরে আসার সময় ওই প্লেনের বর্ণনা দিতে পারত না কেন!  মনে হত যে, ও মিথ্যেই বলছে হয়তো অন্য কারও কাছে শোনা গল্পের মধ্যে গুঁজে দিচ্ছে নিজেকে! আবার পরক্ষণেই মনে হত যে, ওর তো সত্যিই কোনও খোঁজখবর ছিল না বেশ কিছুদিন! তখন ও ছিল কোথায়? বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করত যে, ও হয়তো সত্যিই খুব বড়ো বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়েছিল। কপালজোরে উদ্ধার পেয়েছিল।

        মাঝে মাঝেই আমার এই বিষয়টা নিয়ে খোঁজখবর করতে ইচ্ছে করেছে সত্যিটুকু জানার জন্যে। কিন্তু সত্যিটুকু জানা আর হয়নি। বরং আজও মনে পড়ে ওই হ্যারিকেনের আলোয় দেওয়ালে দুলতে-থাকা ছায়ার সামনে বসে ওর ভিয়েতনাম নিয়ে বলে-যাওয়া গল্প। মনে হয় যে, হয়তো ও গুলই দিত। মিথ্যেই বলত। কিন্তু আজ আর মিথ্যের নানা স্তরে লুকিয়ে থাকা বহুবিধ বিচিত্র সামাজিক সত্যকে আতস কাচ নিয়ে খুঁজে দেখতে ইচ্ছে করে না। আজ বুঝি যে, ‘গুল’-এর কেবল সামজিক অভিজ্ঞানই নেই, কোনও কোনও গুল বরং বাস্তবের প্রান্তর যেখানে শেষ হয়ে শুরু হয় বাস্তবের চেয়েও আরও বড় এক বাস্তবের প্রান্তর, সেই দিগন্তরেখায় আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। উঁহু, এই যে বাস্তবের কথা বলছি একে কিন্তু ঠিক ‘পরাবাস্তব’ বলা যাবে না; যা আমার কাছে ‘পরাবাস্তব’, তাই অন্য একজনের কাছে ঘোরতর ‘বাস্তব’।

তাই, আজ ভালো লাগে এইটে ভাবতে যে, সাধনদা ছিল এক কথক, এক শিল্পী। শিল্প তো এক ধরনের মিথ্যেই, যা বাস্তব। এক সোনার বুদ্বুদ।


স্কেচ: দেবাশিস সাহা


Saturday, June 20, 2020

চীন নিয়ে কেন কিছু লিখছি না?

একজন এই প্রশ্ন করেছেন আমাকে যে, চীনের এই ‘ভারত-আক্রমণ’, এই ‘ভারত ভূখন্ড দখল করা’ নিয়ে কেন কিছু লিখছি না? প্রশ্ন করেছেন আজকের যুগের ‘চিঠি’তে, মানে ‘মেসেজ’ করে, ইনবক্সে। প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে, একবার রমাপদ চৌধুরী ওঁকে বলেছিলেন যে, ‘বুদ্ধিযস্য’ লেখার সময় ওঁর নামে বারো হাজার চিঠি এসেছে। প্রণবদা গিয়ে দেখেন যে, চিঠি এসেছে মোটে বারোটি। রমাপদবাবু ওঁকে বলেছিলেন যে, মনে রাখতে হবে যে, এক হাজার জন যদি ভাবেন চিঠি লিখবেন তাহলে চিঠি লেখেন মোটে একজন। অর্থাৎ একটি চিঠি =একহাজার চিঠি, তাই প্রণবদার নামে আসা চিঠির সংখ্যা বারো হাজারই। অকাট্য যুক্তি। এই যুক্তিতে আমাকে একজন জানতে চেয়েছেন মানে, আসলে এক হাজার জন জানতে চাইছেন চিন নিয়ে আমি নীরব কেন। তাই দু’এক কথা লিখতেই হয়।

        প্রথমেই বলি যে, করোনার আতঙ্কে যখন গোটা বিশ্ব কম্পমান, তখন সীমান্তে এই অস্থিরতা কি আমি সমর্থন করছি? সমর্থন করছি চীনের এই আগ্রাসী মনোভাব? এক কথায় উত্তর হল, না। যে-জওয়ানরা শহীদ হলেন, তাঁদের প্রতিও অন্তরের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অসীম। সারা বছর এঁরা অতন্দ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকেন বলেই আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমোই। আর যারা এই লড়াইয়ে শহীদ হলেন, কতখানি ক্ষতি হল তাঁদের পরিবারের, মা-বাবা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যার ভাবলেই মন বিষণ্ন হয়ে পড়ে।

        কোনও প্রশ্ন নেই যে, দেশের সার্বভৌমত্বের সঙ্গে আপোস করা যাবে না। কিন্তু চিনা সেনারা যে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসছে ভারতের সীমানার দিকে, যে-কোনও সময়ে ঢুকে পড়বে সীমানার এপারে, কেউ কেউ বলছেন, সেই খবর নাকি পাওয়া গিয়েছিল অনেকদিন আগেই। আবার কেউ কেউ বলছেন যে, এ হল ভারতের গোয়েন্দা ব্যর্থতা! খবর ছিল না। এই প্রশ্নও কেউ কেউ  তুলেছেন, যখন জানা গেল এই আগ্রাসনের কথা, তখনই কেন উপযুক্ত স্তরে দ্বিপাক্ষিক কথা শুরু হল না? এরই মধ্যে আবার জানা গেল যে, চিনা সেনার ভারতের মাটিতে এক ইঞ্চিও নাকি প্রবেশ করতে পারেনি। বিশ্বাস করুন, আমি সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত! কী লিখব?

        আর রইল দেশ জোড়া চিনা-পণ্য বয়কটের ডাক। বেশ কিছু ব্যবসায়ী সংগঠন দিয়েছে এই ডাক। ডাক দিয়েছেন সাধারণ মানুষেরাও। তাঁদের অনেকেই চিনা পণ্য পুড়িয়েছেন। টিভি ছুড়ে আছড়ে কেউ ফেলেছেন রাস্তায়। কেউ কেউ বলছেন, চিনকে শাস্তি দিতে গেলে চিনকে অর্থনৈতিক ভাবে বয়কট করতে হবেই। কিন্তু, কেউ কেউ আবার ভিন্নসুরে গাইছেন। বলছেন, কী হবে সেইসব চিনা পণ্যের যা দোকানে দোকানে ইতিমধ্যেই মজুত আছে? সেইসব পুড়িয়ে দিলে তো ছোট ব্যবসায়ীদের বিপুল ক্ষতি! অনেকেই বলছেন যে, ভারতের বাজারে যেভাবে ঢুকে আছে চিন, তাতে ‘বাতিল করো’ বললেই একদিনে চিনকে ভারতের বাজার থেকে বাতিল করা যাবে না! কীভাবে রাতারাতি বাতিল হবে রিয়্যাক্টর, বয়লারের মতো জরুরি যন্ত্র? জীবনদায়ী নানা ওষুধ তৈরির কাঁচামাল? কলেজ -বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-ছেলেটি বা মেয়েটি একটি চিনা স্মার্টফোন ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস করছে, সে এখন দুম করে সেই ফোন পারবে তো ছুড়ে ফেলতে? ঠিক কী যে করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারছি না। প্রশ্ন গুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা বলতেও পারছি না। তো, লিখব কী?

        একটি কথা বললে এখনই ‘দেশদ্রোহী’ বলা হবে, কিন্তু আবেগের সঙ্গে একটুখানি যুক্তি মিশিয়ে যদি ভাবি তাহলে বরং এই প্রশ্ন করা উচিত যে, গত এক দশক বা তারও একটু বেশি সময় ধরে বিশ্বরাজনীতিতে চিন এতখানি শক্তিধর হয়ে উঠল কীভাবে? শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে ও-দেশে বাজেট-বরাদ্দ কতখানি? সেখান থেকে কি আমরা কিছু শিখতে পারি?  কিন্তু ওই যে, এইসব কথা বললেই বলা হবে ‘চিনের দালাল’!

দিন কয়েক আগে খানিক তথ্য ঘাঁটাঘাঁটি করে একটি লেখায় বলেছিলাম যে, ইউরোপে যে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে তা চিন থেকে আসা ভাইরাস নয়। এবং করোনা ভাইরাসকে ‘চিনা ভাইরাস’ বলা ঠিক হচ্ছে না। তখনও অনেকজনের পছন্দ হয়নি কথাটা! কিন্তু এখন সংবাদপত্রেই প্রকাশ পেয়েছে এই খবর যে, চিনে ডিসেম্বরেরে শেষ দিকে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি খুঁজে পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই ইতালিতে মিলান ও তুলিন-এ বর্জ্য জলের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল করোনা ভাইরাস!

        এই সব কথা লিখছি বলে কি আমি সত্যিই ‘চিনের দালাল’? সমর্থন করছি আমাদের দেশের সীমান্তে চিনের আগ্রাসী ভূমিকা? প্রস্তুত আছি দেশের সার্বভৌমত্ব বলিদানে? না। একেবারেই না। শুধু আমি না, যাঁদের বলা হয় যে, এঁরা চিনের কোনও দোষ দেখতে পারেন না, তাঁরাও কিন্তু সব বিষয়ে চিনের প্রশংসা করেন না। একটি ছোট বইয়ের কথা এই প্রসঙ্গে বলব। বইটির লেখক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। নাম “স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা”।  এই বইটিতে চিনের সাফল্যকে কেবল বিস্ময়মুগ্ধ দৃষ্টিতেই দেখেননি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দেখেছেন মোহমুক্ত দৃষ্টিতেও। বইটির দু’টি অংশ পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি। বইটির একটি পর্বের শিরোনাম, ‘চাঁদেরও কলঙ্ক আছে’। সেই পর্বে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন: “চীনের সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ সমস্যা বিশাল সংখ্যক কোটিপতিদের আবির্ভাব। যেহেতু সমাজতন্ত্রের বর্তমান স্তরে চীনের সরকার কিছু পুঁজিবাদী সংস্থাকে স্বীকৃতি দেয়, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তারা পায়, ব্যক্তিগত পুঁজি হওয়া সত্ত্বেও তাদের লভ্যাংশ অথবা মুনাফা নিয়ে তারা এখন কোথায় যাবে? সরকারই বা কী করবে? সরকারি পক্ষে একবার বলা হয়েছে দেশের সবাইকে একসঙ্গে কোটিপতি করা যাবে না, তাহলে কতদিনে করা যাবে? কোটিপতি করাই কি লক্ষ্য? সরকার একবারও বলেনি কাউকেই পুঁজিপতি করা যাবে না। এটি একটি জটিল সমস্যা। শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত নির্ধারণেও মূল প্রশ্ন”। 

        বইটির ‘উপসংহার’-এ শেষ কথাক’টি বলার আগেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লিখেছেন: ‘যে প্রশ্ন আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে তা হল যে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় লক্ষকোটি সাধারণ চীনা নাগরিকদের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে তার জবাব কী? লক্ষকোটি নাগরিক যাঁরা রাজনীতির বলয়ের মধ্যে নেই তাঁদের নিজেদের বাড়িতে ঘরে বসে শারীরিকভাবে আক্রান্ত হতে হয়েছে অজানা অপরাধে। পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছেন। মেয়েদের চুল কেটে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সংগৃহীত চিত্রশিল্প পোড়ানো হয়েছে। এর কোনও প্রতিকার ছিল না? প্রশাসন কোনও ভূমিকাই পালন করল না, বিচারব্যবস্থাও হস্তক্ষেপ করল না! এই বিষয়টি চীনদেশে ভ্রমণের সময় আমাকে বার বার চিন্তিত করেছে”।

        এই লেখা পড়লে মনে হয় যে, যাঁদের ‘চিনের দালাল’ বলে মনে হয়, তাঁরা আসলে ‘চিনের দালাল’ নাও হতে পারেন! মনে হয় যে, চিনেও অনেক মানুষ আছেন যাঁরা আমাদেরই মতো সীমান্তে শান্তি চান। দুই রাষ্ট্রের সংঘাত চান না।

        শেষে একটি কথা। এরপর থেকে এই ব্লগে শুধুই যে সাম্প্রতিক সময় নিয়ে গদ্য লিখব, তাই নয়। লিখব অন্য নানা বিষয় নিয়েও। ব্লগটি তো আমার। পাঠক আমায় একটু স্বাধীনতা দেবেন আশা করি।  

 

স্কেচ: দেবাশিস সাহা

 



Friday, June 19, 2020

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে কাজ দিতেই হবে, কিন্তু অন্যের কাজ কেড়ে নয়


হাজারো অসুবিধে অতিক্রম করে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড় অংশই নিজেদের নিজেদের রাজ্যে ফিরেছেন। সে-ফেরা তাঁদের কাছে সুখকর হয়নি। মূল্য চোকাতে হয়েছে সীমাহীন। এবং নিজেদের রাজ্যে ফিরেও তাঁদের দুর্দশা কাটছে না।

        প্রথমে তো এই শ্রমিকদের অনেককেই পড়তে হয়েছিল সামাজিক বাধার সামনে। এই রকম ছবিও আমরা দেখেছি যে, এঁদের কাউকে কাউকে থাকতে হয়েছে গাছে বাসা বেঁধে। অনেককে নিজেদের গ্রামে বা অঞ্চলে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। যাঁরা কোনওমতে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পেরেছিলেন, তাঁদের আবার কখনও বা রাখা হয়েছিল অচ্ছুৎ করে। এইবার এঁরা এক অন্য বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

        অনেকেই এই দাবি তুলেছিলেন যে, এই পরিযায়ী শ্রমিকদের পকেটে সরাসরি কিছু অর্থের যোগান দিতে হবে। সে-কাজ গোটা দেশজুড়ে করা হয়নি। এরপরে দাবি ওঠে যে, এঁদের নিজেদের রাজ্যেই কাজে নিযুক্ত করতে হবে। গ্রামের দিকে যতটা সম্ভব এঁদের যুক্ত করতে হবে একশো দিনের কাজে। শহরাঞ্চলে এঁদের দিতে হবে অন্য কাজ, দক্ষতা অনুযায়ী।  আমাদের রাজ্যে অন্তত এই কাজটি শুরু হয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের চাকরি দিতে আলাদা ওয়েব পোর্টাল এবং মোবাইল অ্যাপ চালু করা হচ্ছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে এই শ্রমিকদের ‘স্কিল ম্যাপিং’-এর। যাতে এঁদেরকে দক্ষতা অনুযায়ী সঠিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করা যায়। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে নিরন্তর চলতে থাকা কেন্দ্র-রাজ্য কাজিয়ার মধ্যে রাজ্যের এই উদ্যোগটিকে  একটি জরুরি এবং ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবেই আমি অন্তত দেখছি। আশাও রাখছি যে, এই উদ্যোগটি সঠিকভাবে রূপায়িত হবে, শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক রং দেখা হবে না।

কিন্তু এই কাজটি যেখানে যেখানে শুরু করবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেখানে অন্য  কয়েকটি সমস্যা সামনে আসতে শুরু করেছে। যেমন আমি যে-জেলায় থাকি সেই পূর্ব বর্ধমানের দাঁইহাট পুরসভায় পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি অংশকে শহর সাফাইয়ের কাজে লাগাতে চাইছেন পৌর কর্তৃপক্ষ। ভাবনাটি সামনে আসতেই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছেন এতদিন পর্যন্ত সাফাইয়ের কাজে যুক্ত থাকা কর্মীদের একটি অংশ। এমন একটি খবরই প্রকাশ পেয়েছে একটি দৈনিক পত্রিকায়।  সাফাই কর্মীদের বিক্ষোভের কারণ কী? তাঁরা আশংকা করছেন যে, তাঁদের একটি অংশকে ছাঁটাই করেই পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করার ভাবনাচিন্তা চলছে। তাঁদের আশংকা যে অমূলক নয় তা বোঝা গেছে দাঁইহাট পুরসভার প্রশাসকের কথাতেও। তিনি বলেছেন যে, বর্তমান সাফাইকর্মীদের একটি অংশ কাজে আসছিলেন অনিয়মিত ভাবে। তাঁদেরই চিহ্নিত করে ‘বসিয়ে দেওয়া’র ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে। এরই উত্তরে সাফাই কর্মীদের কেউ কেউ বলেছেন যে, এতদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, করোনার ভয় উপেক্ষা করে যাঁরা কাজ করলেন, তাঁদের ছাঁটাই করা চলবে না। দৈনিক মজুরি বৃদ্ধির দাবিও তাঁরা তুলেছেন, যা মেনে নিতে রাজি নন কর্তৃপক্ষ।

দৈনিক মজুরি এক্ষুনি বাড়ানো সম্ভব না-হলেও কাজে বহাল-থাকা সাফাইকর্মীদের ছাঁটাই করার সিদ্ধান্তটি কিন্তু সঠিক হবে না। এতে পরিস্থিতি ঘোরালো হতে পারে। কাজে গাফিলতি থাকলে ছাঁটাই করার পরিবর্তে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু এই আকালের দিনে সরকারে দায়িত্ব এটাই দেখা একজন গরীব মানুষকেও যেন সরকারি কোনও সংস্থার কোনও পদক্ষেপে কাজ না-হারাতে হয়।

এটিও বলতে হয় যে, কাজে বহাল-থাকা কর্মীদের পরিবর্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে যুক্ত করার ভাবনাটি সঠিক ভাবনা নয়। এতে দুই অংশের গরীব মানুষকে মুখোমুখি লড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যা একেবারেই কাম্য নয় এখন।

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিজেদের রাজ্যে কাজ দিতেই হবে। এই ক্ষেত্রে, চেষ্টা করলে, পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশকে পথ দেখাতে পারে। কিন্তু কাজে বহাল-থাকা শ্রমিকদের পরিবর্তে যদি পরিযায়ী শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত করা হয়, তাহলে শুধু ভাবের ঘরে চুরি করাই হবে না, এক অন্য সংকট ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করা হবে।

শহরাঞ্চলে বিশেষ করে যা প্রয়োজন তা হল ওই ‘স্কিল ম্যাপিং’ করে দ্রুত এই পরিযায়ী শ্রমিকদের, যতখানি সম্ভব হয়, দক্ষতা অনুযায়ী কাজ দেওয়া। প্রয়োজনে কাজের নতুন নতুন ক্ষেত্রও চিহ্নিত করতে হবে।

অপরিকল্পিত লকডাউনের ফলেই আমাদের দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে যে-সমস্যা তৈরি হয়েছে তার শেকড় চলে গিয়েছে অনেক গভীরে। চটজলদি এই সমস্যার সমাধান করে হাততালি কুড়োতে গেলে কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। বরং একটুখানি ধীরে চললে, সঠিক পরিকল্পনা করে এগোলে, মন্দ হয় না। ততদিন সরকারগুলির উচিত এই অংশের মানুষদের পকেটে সরাসরি কিছু অর্থ দেওয়া। আর এই কাজে মূলত এগিয়ে আসতে হবে কেন্দ্র সরকারকেই।

শুকনো রেশনে কিন্তু সমস্যার চিঁড়ে ভিজবে না।

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা


Thursday, June 18, 2020

দু'টি কবিতা


খেলাধুলোর থেকে দূরে


হাড় আর মাংস দিয়ে বানানো

এক প্রাচীন পালঙ্কের তলা থেকে

আমি তাকে বের করে আনি।

 

বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে নয়

গ্রীষ্মের উদাস বিকেলে

সুতো ছাড়ি, সুতো ছাড়ি...

 

মাঞ্জাবিহীন ধবধবে একটা সরু সুতো দিয়ে

আমাকে ছুঁয়ে থেকে

একটা আকাশি আকাশে

উড়তে থাকে একফোঁটা ঘন নীল বেদনা

 

আমার ঘুড়ি কাটা পড়েনি কোনওদিন...

 

আষাঢ় শ্রাবণ


এই জন্ম দিচ্ছে আর এই কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। মাঝে মাঝেই থাকছে গুম মেরে। কোনও কোনওদিন পাজি পিটারের মতো সবাইকে বোকা বানিয়ে  আকাশে টাঙিয়ে দিচ্ছে রোদ্দুর। আর কোনও কোনওদিন প্রতিটি অশ্রুফোঁটায় মিশিয়ে দিচ্ছে সাদা পাতার মতো সত্য অনুতাপ।

অন্য কোনও মাস নয়। মানুষ আসলে আষাঢ় আর শ্রাবণের মতো।

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


রাজকল্যাণ চেল: বাংলা কবিতার আন্তর্জাতিক স্বর

বাংলা কবিতা থেকে এক রকম স্বেচ্ছা নির্বাসনই নিয়েছেন রাজকল্যাণ চেল। ক্বচিৎ কখনও একটি-দু’টি পত্রিকায় তাঁর লেখা হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্ত...