Tuesday, July 14, 2020

কবিকে মুক্তি দিন




মানুষ মরে গেলে ভূত হয় না।

কবিরা মরে গেলে ভূত হয় না।

কিন্তু কবিদের মেরে ফেললে তাঁরা ভূত হয়ে যান।

তখন তাঁরা আজীবন আপনাদের তাড়া করে বেড়ান,

ছুটিয়ে মারেন।

উদাহরণ লোরকা, উদাহরণ চে।

তাই বলছি, ওঁকে ছেড়ে দিন।

উনি হয়তো ওঁর স্ত্রী আর কন্যাদের গাল বেয়ে

গড়িয়ে নামতে থাকা মুক্তোর দানাগুলিকে

আর চিনতে পারবেন না।

ঝঞ্ঝার মধ্যে লুকিয়ে থাকা নিজেরই এক প্রিয় পঙ্‌ক্তিকে

ওঁর হয়তো মনে হবে অন্য এক সাহসী চারণের বৃংহণ।

নদীর সঙ্গে কুলকুল বইতে থাকা নিজের আর এক পঙ্‌ক্তিকে

ওঁর হয়তো মনে হবে অশ্রুত সঙ্গীত।

তবু ওঁকে মুক্তি দিন।

 

ভারাভারা রাওকে আপনারা কোনওরকমে সামলাতে পেরেছেন

কিন্তু ভারাভারা রাও-এর ভূতকে সামলাতে পারবেন না।

 

স্কেচ: দেবাশিস সাহা

Monday, July 13, 2020

করোনার পরে অনলাইন ম্যাগাজিন আর ইবুকই কি তাহলে ভবিষ্যত আমাদের?


আমার কাছে ইবুক প্রকাশ করার প্রস্তাব এসেছিল কয়েকটি। কবিতার বই। আমি সবকটি প্রস্তাবেই ‘না’ বলেছি। এদিকে এই গোটা লকডাউন পর্বে বিস্তর লেখালেখি করেছি বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবেই একজন আমাকে জিগ্যেসই করে ফেললেন যে, কেন এই দ্বিচারিতা? অনলাইন ম্যাগাজিনে লিখছি, নিজের ব্লগ খুলেছি, অথচ ইবুক প্রকাশের প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। এ কি স্ববিরোধ নয়?

        বলে রাখি যে, অনলাইন ম্যাগাজিনে আমি আগেও লিখেছি। নিজের ব্লগ খোলার আগে ‘দ্য ওয়াল’-এ ধারাবাহিক ভাবে লিখেছিলাম ব্লগ। এবং সেই লেখাগুলি একত্রিত হয়ে বই হয়ে প্রকাশও পেয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। অর্থাৎ সেক্ষেত্রেও আমি অনলাইন মাধ্যমে লিখলেও লেখাগুলি সংরক্ষণ করার ব্যাপারে ছিলাম ছাপা বইয়ের পক্ষপাতী। সত্যি বলতে কী, এই যে আজকে এই বিতর্ক মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে যে, ইবুক আর ইম্যাগাজিন ছাপা বই আর ছাপা ম্যাগাজিন-এর ইন্তেকাল ঘোষণা করতে চলেছে, এ কিন্তু কোনও নতুন বিতর্ক নয়। গত কয়েক বছর ধরেই এই কথাটা ঘোরাফেরা করছে এ বঙ্গে। ইবুক হয়তো ততখানি আলোচনার মধ্যে ছিল না। কিন্তু অনলাইন ম্যাগাজিন, ফেসবুকের লেখালেখি তো ছিলই।

        কিছুদিন আগেও আমি বিশ্বাস করতাম যে, অনলাইন ম্যাগাজিন ছাপা লিটল ম্যাগাজিন-এর বিকল্প হতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলা থেকে যে বিপুল পরিমান ছোট পত্রিকা প্রকাশ পেত ধারাবাহিকভাবে, তাতে আমার এই বিশ্বাসে চিড় ধরেনি। কিন্তু এক করোনাই সব ধ্যানধারণা বদলে দিল। এই সময়ে একদিকে অনেকগুলি ছাপা ছোটপত্রিকা ব্লগজিন হিসেবে প্রকাশ পেতে শুরু করে দিল, অন্যদিকে নতুন একাধিক ব্লগজিন আত্মপ্রকাশও করল এই ক্রান্তিকালে। এর একটা বড় কারণ হচ্ছে এই যে, এই মুহূর্তে ছাপাখানায় গিয়ে সেইভাবে কাজ করা যাচ্ছে না। এখন কেউ কেউ গুটিগুটি পায়ে ছাপাখানায় গেলেও, কিছুদিন আগে তো ছাপাখানায় যাওয়ার কথা ভাবাও যাচ্ছিল নাকিন্তু একটা ব্লগজিন বানাতে, অল্প একটু টেকনিক্যাল জ্ঞান থাকলে, ছাপাখানায় যাওয়ার তো দরকারই পড়ে না। নিজে নিজে কাজটুকু করতে পারলে খরচও প্রায় শূন্য। আর একথা তো সত্য যে, করোনা  আমাদের  অনেক অভ্যেস পালটে দিয়েছে, নতুন অনেক অভ্যেস রপ্ত করিয়েছেআমরা অনেকেই বন্ধুবান্ধবদের সামান্য সাহায্য নিয়ে শিখে গিয়েছি কীভাবে খুলতে হয় একটি ব্লগজিন। আমার নিজের তাই ধারণা যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ছাপা লিটল ম্যাগাজিন গুলি একে একে আবার নিজেদের স্বরূপে ফিরবে ঠিক, কিন্তু পাশাপাশি বেশ জাঁকিয়েই থেকে যাবে ব্লগজিনগুলি। করোনার আগেও অনেকগুলি পত্রিকাই দু’টি মাধ্যমেই প্রকাশ পেত। সেই ধারা শুধু অব্যাহতই থাকবে না, গতি পাবে। কবিতাকেন্দ্রিক পত্রিকাগুলির অনলাইন সংস্করণ বেশি চালু থাকবে। ছোট লেখা, ফিচারধর্মী লেখা থাকে যেসব ম্যাগাজিন-এ, সেগুলিও বেশি বেশি করে ঢলে পড়তে পারে অনলাইন সংস্করণের দিকে। কিন্তু, সত্যি বলতে কী, উপন্যাস কি আমরা আজও ফোনে বা ল্যাপটপে পড়তে স্বচ্ছন্দ বোধ করি? একটি দুটি অনলাইন পত্রিকা ধারাবাহিক  উপন্যাস ছাপে, দেখেছি। এই উপন্যাসগুলির পাঠকসংখ্যা সম্বন্ধে অবশ্য আমার কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই।

        আগামীতে অনলাইন ম্যাগাজিনের রমরমা বাড়লেও, ইবুক এখনই অনলাইন ম্যাগাজিনের মতো জনপ্রিয় হবে না বলেই আমার ধারণা। অবশ্য ইবুক প্রকাশও অনলাইন ম্যাগাজিন প্রকাশের মতোই সহজ হয়ে গেছে আজ। বাংলা ভাষায় লেখালেখি করা একজন লেখক বা কবি যদি অভ্রর মতো ইউনিকোড সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে তিনি নিজেই একটি ইবুক প্রকাশ করতে পারেন। এই রকম একটি দাবিও উঠেছে যে, নিজেদের বই এইভাবে নিজেরাই প্রকশ করুন কবি-লেখকরা, প্রকাশকদের মধ্যস্থতার দরকার নেই। এখানেও বলে রাখি যে, আন্তন-এর মতো কেউ কেউ করোনার অনেক আগে থেকেই নিজের বই ইবুক হিসেবেই প্রকাশ করছিলেন। চাইলেই পাঠককে দিচ্ছিলেনও সেই বইগুলির পিডিএফ। আমিও ওঁর বইগুলি পিডিএফ ফরম্যাটেই পড়েছি। তিনি অবশ্য বই বিক্রি করছিলেন না। ইবুক বিক্রি করে কবি-লেখকরা যদি এই কঠিন সময়ে সামান্য কিছু রোজগার করতে পারেন, আমি তাহলে তাতে দোষের কিছু দেখি না। সৎ প্রকাশকেরাও যদি এই কাজে এগিয়ে আসেন, তাহলেও আমার আপত্তির কিছু নেই। প্রকাশক মাত্রই তো আর অসৎ নন!

        কিন্ত, ব্যক্তিগত ভাবে আমি ইবুক প্রকাশের পক্ষে নই। বেশ কিছু ইবুক আমাকে নানা প্রয়োজনে পড়তে হয়েছে একথা ঠিক। কিন্তু কেমন যেন ঠিক আনন্দ পাইনি ইবুক পাঠে। আন্তনের বইগুলিও পড়ার সময় আমার বারবার মনে হয়েছিল যে, এত ভালো কবিতা আছে যে-বইগুলিতে সেগুলি কেন ছাপা বই হিসেবে প্রকাশ পেল না? নিজে যে ফরম্যাটে বই পড়তে আনন্দ পাইনি, সেই ফরম্যাটে নিজের বই প্রকাশের কথাও তাই আমি ভাবতে পারিনি এখনও। ব্লগজিনে একটি কবিতা বা ছোট গদ্য বা প্রবন্ধ পড়ার সময় আমার তেমন একটা অসুবিধে হয়নি ঠিক, কিন্তু বই হল বই। তার পাতা ওল্টাতে না-পারলে আবিষ্কারের আনন্দ ঠিক পাওয়া যায় না। এই যুক্তি শুনলে অনেকেই আমাকে প্রাচীনপন্থী বলতে পারেন বলুন, ক্ষতি নেই। কিন্তু বুকের ওপর আধখোলা প্রিয় বইকে রেখে ঘুমিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা যাঁর একবার হয়েছে তিনি তো জানেন যে, প্রিয় বই আসলে প্রিয় নারী বা পুরুষের মতো। তার স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হতে বাঙালি আজও চায় না। খেয়াল করলে দেখবেন যে, বাংলার বড় প্রকাশনা সংস্থাগুলিও কিন্তু এখনও ইবুক প্রকাশের পথে হাঁটতে শুরু করেনি। এবং এই কঠিন সময়েও কলেজ স্ট্রিট থেকে টুকটুক করে ছাপা বই বিক্রি হচ্ছে। বাংলা ভাষার সংখ্যাগরিষ্ঠ কবি-লেখকরাও কি সেইভাবে ইবুক প্রকাশে এগিয়ে এসেছেন? অতি তরুণদের উৎসাহই এই ব্যাপারে বেশি নজরে পড়েছে আমার।

এইসব দেখে কেন জানি না মনে হয় যে, বৃহত্তর বাঙালি পাঠক এখনও ছাপা বই পড়ার পক্ষেই। যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে, ইবুক সংরক্ষণ অনেক সুবিধেজনক। সে তো বটেই। কিন্তু ডিজিট্যাল আর্কাইভ বানানোর ব্যাপারেও কি আমরা বাঙালিরা আজও তেমনভাবে উদ্যোগী হয়েছি? আসলে ছাপা বই-এর সঙ্গে বাঙালি পাঠকের সম্পর্কের ব্রেক-আপ এখনও হয়নি। তাই করোনার পরে অনলাইন ম্যাগজিন-এর রাজ্যপাট বৃদ্ধি পেলেও আমার মনে হয় যে, ইবুক ছাপা বইকে কুপোকাত করতে এখনই পারবে না।

ভবিষ্যতে কী হবে? যেভাবে পুঁথি সরে গিয়ে জায়গা করে দিয়েছিল ছাপা বইকে, সেইভাবে ছাপা বই কি জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে  ইবুককে? বছর কুড়ি পরে ঠিক কী হবে সেকথা এখনই বলা মুশকিলের। ভুল বললাম। শুধু মুশকিলেরই নয়, ‘না-মুমকিন’ও বটে।  

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা


Thursday, July 9, 2020

একটি কবিতা

 

পরবাস


ঘুমের ভেতরে হারিয়ে গিয়েছে একটি কবিতা।

সে আর সাদা পাতার কাছে ফিরে আসতে পারছে না।

ঘুমের ভেতরে সে পথ হারিয়ে ঢুকে পড়েছে এক গভীর জঙ্গলে।

তার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে এক হরিণ শিশু।

গম্ভীর শালগাছ খানিকটা থতমত খেয়ে গেছে তাকে দেখে।

একজন বাঘ আর একজন ভাল্লুক ভাবছে,

এ কে? সদ্যোজাত সন্তানের চেয়েও নিষ্পাপ আর মায়াবী?

 

ওগো হারিয়ে যাওয়া কবিতা,

যদি ইথার তরঙ্গে ভেসে ভেসে যায় আমার শব্দরা

যদি শুনতে পাও, তো বলিঃ

আর ফিরে এসো না,

পথ হারিয়ে তুমি আসলে পৌঁছে গিয়েছ নিজের বাড়িতে।

 

আর ফিরে এসো না

গাছ কেটে বানানো এই সাদা পাতার পরবাসে।

 

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


Thursday, June 25, 2020

গাঁধীকে নিয়ে লেখা একটি কবিতা


গাঁধী ও কবিতা

কে. সচিদানন্দন


গাঁধীকে এক ঝলক দেখবে বলে

একদিন একটা রোগা কবিতা

গাঁধীর আশ্রমে পৌঁছে গেল।

রামের দিকে তাকিয়ে গাঁধী

তখন চরকায় সুতো কাটছিলেন

তার দরজায় অপেক্ষা করতে থাকা

কবিতাটিকে তিনি নজরই করলেন না

কবিতাটা লজ্জা পেল সে কোনও ভজন ছিল না বলে

 

কবিতাটা একটা গলা খাঁকারি দিল

আর গাঁধী আড়চোখে তাকে দেখলেন

সেই চশমা দিয়ে যে চশমা

দেখেছে নরক।

“তুমি কি কখনও সুতো কেটেছ?”, তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“কখনও টেনেছ মেথরের গাড়ি?

কখনও সহ্য করেছ

খুব ভোরের রান্নাঘরের ধোঁয়াকে?

তুমি কি কখনও থেকেছ বুভুক্ষু?”

#

কবিতাটা বললঃ “আমি জন্মেছিলাম

জঙ্গলে, এক শিকারির মুখে।

এক জেলে আমাকে এই কুটির অব্দি নিয়ে এসেছে।

কিন্তু তবুও, আমি কোনও কাজ জানি না, আমি কেবল গান গাই।

প্রথমে আমি রাজসভায় গাইতাম

তখন আমি হৃষ্টপুষ্ট আর সুদর্শন ছিলাম,

কিন্তু আমি এখন পথে পথে ঘুরে বেড়াই,

অর্ধভুক্ত”

#

একটা সেয়ানার হাসি হেসে গাঁধী বললেন,

“তাও ভালো। কিন্তু তোমাকে

এই মাঝে মাঝে

সংস্কৃতে কথা বলার অভ্যেস

ছাড়তে হবে

মাঠে যাও, কৃষকের ভাষা

শোনো”

#

কবিতাটা একটা শস্যের দানা হয়ে গেল

আর মাঠে অপেক্ষা করতে লাগল

কখন চাষি এসে নতুন বর্ষণে সিক্ত

কুমারী মাটিকে উৎক্ষেপ করবে।

 


অনুবাদ: অংশুমান কর


ব্যবহৃত কবির ছবিটি কবির সৌজন্যে পাওয়া

 

 


Wednesday, June 24, 2020

লকডাউনে লেখা কবিতা-১


ধার-বাকির জীবন

ধারের ওপরেই চলছে জীবন।

বাঙ্কের কাছে হাত পাতি

ব্যাঙ্ক ধার দেয়।

জীবন বিমা নিগমের কাছে হাত পাতি

মেলে কিছু।

বন্ধু-বান্ধবদের বলি, দাও ভাই

দু-তিন মাসের মধ্যে শোধ করে দেব,

ফেরায় না কেউ।

ধার-বাকিরই জীবন।

চলে যায় এভাবেই।

এমনকি

গাছ, জল, মাটিও

শোধ দিতে পারব না জেনেই

একদিন ধার দেয় শক্তি,

একদিন সৌন্দর্য।

শুধু এই অসময়ে

লজ্জায় 

কারও কাছে কিছুতেই চাইতে পারছি না

তরতাজা একটি মন।

 

 

অলংকরণ: দেবাশিস সাহা

 


  ­ ­ বাংলা কবিতায় অলোকরঞ্জনী অবদান –হরভজন সিংকে আবার ধরিয়ে দেবে না তো? ফোনের অন্য প্রান্তে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত। এ পাশে আমি। কথা হচ্ছে আশ...